• শিরোনাম

    জামিন পেয়েই উধাও ৩০০ জঙ্গি!

    | ৩০ মার্চ ২০১৮ | ৫:১০ পূর্বাহ্ণ

    জামিন পেয়েই উধাও ৩০০ জঙ্গি!

    জামিন পেয়েই উধাও ৩০০ জঙ্গি!

    বিশেষ প্রতিবেদক

    কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে কমপক্ষে ৩০০ জঙ্গি। জামিনের শর্ত অনুযায়ী, তাদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা আদালতে উকিলের মাধ্যমে ‘গরহাজিরা’ চালিয়ে যাচ্ছেন। তদন্তে গাফিলতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    তাদের মতে, এসব মামলার আসামিদের যথাসময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে জঙ্গি হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। মুক্তজীবনে তারা আবারও জঙ্গিবাদে যুক্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের। জামিনে মুক্ত হওয়া অধিকাংশ জঙ্গিই গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে ছিলেন।

    গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২ জুন থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে কমপক্ষে ৩০০ জন জঙ্গি সদস্য জামিনে মুক্তি পায়। এদের বেশিরভাগই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি। জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত জঙ্গির মধ্যে অনেকেই কারাফটক থেকে ফের গ্রেফতার হয়েছেন। পরে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে জামিন নেওয়া জঙ্গিরা ফের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছেন কি না, তা তদারকি করতে সমন্বয় সেল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামিনের পর আসামিদের জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতা ও উগ্রবাদী মনোভাব পরিবর্তন

    না হওয়ায় নতুন নতুন কৌশলে ফের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে নাশকতামূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন তারা। এদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত গুপ্তহত্যা ও নাশকতাকারীদের গোপন যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জামিন লাভের পর জঙ্গি-আসামিদের বর্তমান অবস্থান, কর্মকাণ্ড ও তৎপরতার ওপর নজরদারি কম থাকায় তারা ফের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়তে পারেন। এদের মধ্যে অনেকেই কারাবন্দি অবস্থায় অন্য শীর্ষ জঙ্গিদের সংস্পর্শে থেকে নতুন করে জঙ্গিবাদের তালিমও নিয়েছেন। তাই জামিনে বেরিয়ে যাওয়া জঙ্গিরা আরো ভয়ংকর রূপে ফিরছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেফতার হওয়ার পর এর সত্যতাও মিলেছে।

    আদালত সূত্র জানায়, বছরের পর বছর ঝুলে আছে কমপক্ষে ৮০০ জঙ্গি মামলা। এর মধ্যে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫৫০টি। আর ধীরগতিতে চলছে ২৫০ মামলার তদন্ত কাজ। এসব মামলায় প্রায় চার হাজার জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে, জঙ্গিরা জামিন নিয়ে পলাতক হলেও আসামির জামিনদারদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা নেই। তাদের কারো বিরুদ্ধেই অদ্যাবধি নেওয়া হয়নি কোনো ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা নির্বিঘ্নে জামিন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। পলাতকদের মধ্যে অন্তত দুই ডজন ভয়ংকর জঙ্গি রয়েছে, যারা সমরাস্ত্র পরিচালনাসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরিতে পারদর্শী।

    সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠনগুলোর উত্থানের নেপথ্যে এসব দুর্ধর্ষ জঙ্গি কলকাঠি নাড়ছে। আবার কেউ কেউ কারাগারে আটক থেকেও জঙ্গি তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান চালিয়েও জামিনে পলাতক জঙ্গিদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জামিনে মুক্ত এসব সন্ত্রাসী কোথায় আছে সে ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই গোয়েন্দাদের কাছে। এসব পলাতক জঙ্গিকে দ্রুত গ্রেফতার করা না গেলে দেশ নিরাপত্তা হুমকিতে থাকবে বলে আশঙ্কা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।

    সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ১৯ বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টার্গেট কিলিং ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় দায়ের হয়েছে উল্লিখিত সব জঙ্গি মামলা। বিপুলসংখ্যক মামলা ঝুলে গেলেও এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। শাস্তি হয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জঙ্গির। এদের মধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১০ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার গুরু ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নেতা মুফতি হান্নান, হুজি সদস্য শরিফ শাহেদুল আলম বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয়। ১৪ বছর আগে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় তাদের এ ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

    এর আগে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, আবদুর রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি, জামাতা আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হোসেন মামুন ও খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে ফারুকের ফাঁসি কার্যকর হয়। একই মামলায় পলাতক জেএমবি সদস্য আরিফ পরে গ্রেফতার হলে ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর তার ফাঁসি কর্যকর হয়। ২০০৫ সালে ঝালকাঠিতে বোমা হামলা চালিয়ে দুই বিচারক হত্যা মামলায় তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

    এদিকে, জঙ্গি ও সন্ত্রাস নির্মূলে সরকারের অগ্রাধিকার ও আন্তরিকতা থাকলেও মামলার তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। চাঞ্চল্যকর এসব মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেপথ্যে মদদদাতাদের খুঁজে পাচ্ছে না। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, ছোট ছোট সিøপার সেলে জঙ্গি সদস্যরা কাজ করায় গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্য জঙ্গিদের ধরা যাচ্ছে না। বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় তাদের অবস্থানও চিহ্নিত করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। অপরদিকে, তদন্ত শেষে যেসব মামলায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হচ্ছে, সেসব মামলার বিচারেও তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। নিয়মিত সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মূলত এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম গতি হারাচ্ছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ সাক্ষীরা ভয়ে আদালতে সাক্ষী দিতে হাজির হচ্ছে না। এমনকি সাক্ষী হিসেবে যেসব পুলিশ সদস্য রয়েছেন, তারাও আদালতে অনুপস্থিত থাকছেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে জঙ্গি মামলার তদন্ত ও বিচারে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে। বিচার প্রার্থীরা অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে হতাশ হয়ে পড়েছেন।

    ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু বলেন, জঙ্গি-সংক্রান্ত অনেকগুলো মামলা এখনো তদন্তাধীন। অনেক মামলার চার্জশিটও হয়েছে। জঙ্গি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই। দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদালতে সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেন তিনি।

    এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, জামিন নিয়ে আসামি পলাতক হলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জামিনদারের জবাবদিহিতার নজির সৃষ্টি না হলে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।

    নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গি মামলা তদন্তে পুলিশের ত্রুটি আছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে না পারলে তারা জামিন পেয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে জঙ্গিদের জামিন পেয়ে যাওয়ার বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। কারণ, জামিন পেয়ে তারা লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। আত্মগোপনে থেকেই তারা মানুষকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে। তাই একদিকে যেমন দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে তেমন জঙ্গিরা যেন জামিন না পায় সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

    ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেন, যেসব জঙ্গি জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তারা যেন ফের সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে না পারে সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

    জামিন নিয়ে পলাতক কয়েকজন জঙ্গি : সিরিয়ার আইএস নেতা ব্রিটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান ২০১৪ সালে ঢাকায় ‘মুজাহিদ’ সংগ্রহে এসে গ্রেফতার হন। ২০১৭ সালে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। এরপর থেকেই লাপাত্তা তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে পলাতক দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—কাওছার হোসেন, কামাল উদ্দিন, গোলাম সারওয়ার, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, নূর ইসলাম, আমিনুল মুরসালিন, মহিবুল মোত্তাকিন, রফিকুল ইসলাম মিরাজ ও মশিউর রহমান, তানভীর, তৌহিদুল, সাইদুর, সাইফুল, আজমীর, রেজাউল, নাঈম, জুম্মন, আমিনুল, আকরাম, জুনায়েদ, মানিক, মাজিদ, সাজেদুর, ফারুক, শফিক, মিলন, কফিল উদ্দিন ওরফে রব মুন্সি, আজিবুল ইসলাম, শাহান শাহ, হামিদুর রহমান, বজলুর রহমান, বাবর, শরিফ, খাইরুল ইসলাম, ওয়ালিউল্লাহ ওরফে হামিদ, জাকারিয়া, সবুজ, নাদিম, ময়েজ উদ্দিন, মহব্বত ওরফে তিতুমীর ওরফে নাহিদ, শিহাব হোসেন, পারভেজ শেখ, আজহারুল হান্নান (অরেঞ্জ), নূর মোহাম্মদ ওরফে ল্যাংড়া মাস্টার, জামিল হোসেন, আব্দুর রশিদ, শাহাদাত হোসেন, রেদোয়ান, ইশরাত আলী শেখ, আব্দুল হাকিম মন্ডল, জাহিদুল ইসলাম, ওয়াহিদুল ইসলাম, আবু সোয়াইব, জাবেদ আল রাফিয়ান, ইকবাল মাহমুদ রিপন, সোহেল আহমেদ সোহেল, মহিউদ্দিন, গোলাম কিবরিয়া খান, ওমর শরীফ, রোমান, মুফতি জাফর আমিন, আনোয়ার হোসেন, উসমান গনি, আমিনুল ইসলাম, গিয়াস উদ্দিন, আলম মাহবুব, তানভীর আহমেদ তনয়, মারজিয়া আক্তার সুমি, এসএম সানায়েত বিন মোস্তাফিজ (সুজন), আফজাল হোসেন, আব্দুল কাউয়ুম, আমির হামজা, রাজু মিয়া, ওমর ফারুক, সোলাইমান, সুলতানা বেগম ওরফে সুলতানা রহমান কচি, আকলিমা মনি, ইসরাত জাহানা মৌসুমী ওরফে মৌ, খাদিজা বেগম মেঘলা, তৌহিদ মিয়া, মহিবুল্লাহ, আব্দুল্লাহ আল নোমান, মহিউদ্দিন, আকরাম হোসেন, আসরাব আলী, ইসতিমনা আক্তার ঐশী, আবিদ হাসান কাদির, সাইমুন সোহেল, মিনহাজ আবেদীন, আজিজুর রহমান, গাজী মোহাম্মদ বাবুল, ইউসুফ নুরানী, জাফর ইকবাল, চায়নুর রহমান (বাবুল), আশরাফুল আলম, রাসেল ওরফে কবির হোসেন, মেজবাউর রহমান, হিজবুর রহমান ও মো. সিকান্দার আলী নকি।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
    হাজীগঞ্জে ছোট বোনের হাতে বড় বোন খুন
    হাজীগঞ্জে ছোট বোনের হাতে বড় বোন খুন