• শিরোনাম

    ৩২ ধারা নিয়ে প্রশ্ন

    | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ৮:০১ পূর্বাহ্ণ

    ৩২ ধারা নিয়ে প্রশ্ন

    ৩২ ধারা নিয়ে প্রশ্ন

    আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া

    নিজস্ব প্রতিবেদক্

    গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের আইনগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা প্রশ্নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা বিতর্কিত রূপ নিয়েছিল। ধারাটি প্রয়োগ করে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার নামে হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ধারাটি বাতিলে পথে নামে গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সরকার শেষ পর্যন্ত আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করে গত সোমবার মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদন করে। কিন্তু নতুন আইনের খসড়ায় খুশি হতে পারেননি গণমাধ্যমকর্মীরা।

    গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করলেও নতুন আইনে ৫৭ ধারার বিষয়বস্তুগুলো চারটি ধারায় ভাগ করে রাখা হয়েছে। এজন্য আলাদা আলাদা শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইসিটি আইনে ৫৭ ধারায় মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো-সংক্রান্ত বিষয়গুলো একত্রে ছিল।

    সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে নতুন আইনের ৩২ ধারা নিয়ে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। কেউ যদি এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে।

    webnewsdesign.com

    এই ৩২ ধারা স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বাধা হবে বলে মনে করছেন সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ। তাদের মতে, ৫৭ ধারার বিষয়গুলো ৩২ ধারায় কঠোরভাবে ফিরে এসেছে। বিশেষ করে নথি কপি করাকে গুপ্তচরবৃত্তি ধরলে সাংবাদিকদের কাজের পরিধি সংকুচিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সুযোগে সরকারি অফিসে দুর্নীতি বাড়বে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। ৫৭ ধারার মতো ৩২ ধারারও অপপ্রয়োগ হতে পারে বলে শঙ্কা আইন বিশেষজ্ঞদের।

    আইনটি সংসদে পাসের আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এর অপপ্রয়োগ বন্ধে যথাযথ সংশোধন করার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন স্তরের মানুষ।

    এর আগে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে আইসিটি আইনের অধীনে মোট ১৪১৭টি মামলা ফাইল করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ শতকরা ৬৫ ভাগই হয়েছে ৫৭ ধারার অধীনে মানহানি মামলা। বিচার শেষে বা বিচার চলাকালীন শতকরা ৬৫ ভাগ অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছেন আদালত। উপরন্তু ১৮০টি মামলায় অভিযোগের কোনো যুক্তিযুক্ত কারণই খুঁজে পায়নি পুলিশ।

    অবশ্য নতুন আইনে হয়রানি বা আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট ও অন্যান্য মন্ত্রী। তাদের মতে, উদ্বেগের কোনোই কারণ নেই। সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে আইনটি বাধা হবে না। বরং আইনটি অপসাংবাদিকতা রোধে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন তারা।

    এ ব্যাপারে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ৫৭ ধারায় আগে ন্যূনতম সাজা ছিল, বর্তমান আইনে তা নেই। বিচারক অপরাধ অনুযায়ী, সাজা দেবেন। সর্বোচ্চ সাজাও কমিয়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, ৫৭ ধারা ২০০৬ সালেও ছিল, তখন কেউ কিছু বলেনি। ২০১৩ সালে ৫৭ ধারা সংশোধন করে অজামিনযোগ্য করে ন্যূনতম সাজা সাত বছর করার পর অপপ্রয়োগের প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এখন ৫৭ ধারাকে চার ভাগে চারটি অপরাধে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ অপরাধ আর রাষ্ট্রীয় অপরাধের সাজা এক হবে না—এটাই স্বাভাবিক। এই আইনের কোথাও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা হয়নি। বরং অপসাংবাদিকতা রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

    একইভাবে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, বিতর্কিত ৫৭ ধারাটি বাকস্বাধীনতা হরণ করার ‘একটি উপায়’ ছিল। ওই ধারার বিষয় প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যুক্ত করা হলেও তাতে বাক বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়নি। ৫৭ ধারার যে ‘অপপ্রয়োগ’ হচ্ছিল, নতুন আইন হলে তা বন্ধ হবে।

    বিশেষ করে প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারায় ‘অতি গোপনীয়’ বিষয় প্রকাশ করাকে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে উল্লেখ করায় গণমাধ্যমকর্মীরা সবচেয়ে বেশি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে আইনমন্ত্রী এমন ধারা আগেও ছিল ও এখনো আছে এবং দুর্নীতির কোনো খবর প্রকাশ করলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন।

    একইভাবে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, আইনটি সঠিক ও স্বচ্ছতার সঙ্গেই করা হয়েছে। যদি প্রতিবেদন সত্য হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি মনে করেন না। এই আইন সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় বাধা হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

    কি আছে ৩২ ধারায় : ৫৭ ধারায় যেসব কাজ করলে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো সেসব কাজ করলে ডিজিটাল আইনেও অপরাধ হবে বলে উল্লেখ আছে। শুধু ১৭ থেকে ৩২ নম্বর ধারায় অপরাধের সংজ্ঞা বিন্যস্ত করা হয়েছে। ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে।’ আইনটিতে এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ৫৭ ধারায়ও শাস্তির মেয়াদ ছিল ১৪ বছরের কারাদণ্ড। তবে নতুন আইনে দ্বিতীয়বার অপরাধের শাস্তির পরিমাণ করা হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সঙ্গে এক কোটি টাকা জরিমানা।

    বাদ হতে যাওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত-২০১৩)-এর ৫৭ ধারায় বলা হয়, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ফরম বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন কিংবা যার মাধ্যমে মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এই ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হয়, তাহলে তা হবে অপরাধ।’ ৫৭ ধারার সংজ্ঞায় অনলাইন নিউজপোর্টাল বা গণমাধ্যমের কথা সরাসরি উল্লেখ নেই। নেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায়ও।

    প্রশ্ন ও উদ্বেগ : আইনজ্ঞ ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা আগের আইনের মতোই নতুন আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করছেন। তারা বলেছেন, আইনটিতে যেসব ধারা ও শাস্তি রাখা হয়েছে তা গণতন্ত্রের সঙ্গেও সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ আইন শুধু গণমাধ্যম কর্মীদের জন্যই বৈরী হবে না, অন্য পেশার মানুষরাও এর অপপ্রয়োগের শিকার হতে পারেন। ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধেও এ আইন একটি হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    এ ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেন, সরকারের উচিত ছিল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আইনটি করা। এখনো সুযোগ আছে। সবার মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে আইনটি সংসদে পাস করলে ভালো হয়। আর এই পুনর্বিবেচনার উদ্যোগটি সরকারকেই নিতে হবে।

    ড. কামাল হোসেন ৩২ ধারা প্রসঙ্গে বলেন, সরকার কী বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করতে চায় সেটা আইনে ব্যাখ্যা করতে হবে। অপরাধের ব্যাখ্যাও থাকতে হবে। এটা যদি অস্পষ্ট থাকে তবে সবার জন্যই ঝুঁকি। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য। তারা তো এমনিতেই ঝুঁকি নিয়ে রিপোর্ট করেন। রিপোর্ট করার পর আবারও কোনো ঝুঁকিতে যেন তারা না পড়েন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারার আগের ৫৭ ধারার মতোই অপপ্রয়োগ হতে পারে। বিতর্কিত ৫৭ বাতিল হলেও নতুন কিছু ধারায় ৫৭ ধারার বিষয়বস্তু রাখা হয়েছে। যেটা হয়েছে আগে কিছু ধারার শাস্তি জামিন অযোগ্য ছিল, তা এখন জামিনযোগ্য করা হয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তি প্রশ্নে কোনটি গোপনীয় আর কোনটি গোপনীয় নয় তা ঠিক করতে হবে। এর ব্যাখ্যা পরিষ্কার করতে হবে। আগে ৫৭ ধারা নিয়ে অপপ্রয়োগের যে অভিযোগ ছিল এখানেও সেটি হয় কি না তা দেখতে হবে। যদি অপপ্রয়োগ হয় তাহলে এটিও নিবর্তনমূলক আইন হবে।

    প্রস্তাবিত আইনটি সংশোধন হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, এই আইনের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। সাংবাদিকরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। মানুষের তথ্য জানার অধিকার বিঘ্নিত হবে। এমন আইন করা উচিত যা উভয় পক্ষকে নিরাপত্তা দেবে। অবশ্যই অংশীজনের মতামত নিয়ে সংশোধন করতে হবে। নতুবা ৫৭ ধারার মতো এই আইনেরও অপব্যবহার হবে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
    হাজীগঞ্জে ছোট বোনের হাতে বড় বোন খুন
    হাজীগঞ্জে ছোট বোনের হাতে বড় বোন খুন