• শিরোনাম

    স্মৃতিতে সৈয়দ হক

    | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

    স্মৃতিতে সৈয়দ হক

    ১৯৫০ সালে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে প্রথম দেখা। সে সময় তার লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে গিয়েছি অনেক। একটা কথা সে তখন বলত আমাকে, ‘বশীর, তোর সাথে আমার রাস্তায় দেখা হবে। তুই হয়তো গাড়ি করে যাচ্ছিস আর আমি হয়তো হেঁটে।’ তখন থেকেই চালচলনে কেতাদুরস্ত ছিল সে; প্যান্ট-শার্ট-স্যান্ডেলে তাঁকে মানাতও ভালো। শার্ট বেশির ভাগ সময় গোঁজাই পরত সে। নর্থব্রুক হল রোডের ক্যাপিটাল রেস্তোরাঁয় আমরা আড্ডা দিতাম বেশুমার। সেখানে সে আসত। আমার খাতায় সে সময় সৈয়দ হক ‘মুর্তজা বশীরকে’ উল্লেখ করে একটি ছোট্ট কবিতাও লিখেছিল আর ইংরেজিতে এক অঙ্কের একটি নাটক লিখে দিয়েছিল আমাকে, যার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ছিল এই ইংরেজি বাক্যকতক, ‘ইট উইল বি পাবলিস আফটার মাই ডেথ।’ এখন নাটকটি খুঁজে দেখতে হবে। হয়তো আমার সংগ্রহে আছে কোথাও। খুঁজে পেলে তার অন্য একটা মাত্রা আবিষ্কার করা যেতে পারে।
    ১৯৫৬-তে ‘পেইন্টাস ইউনিট’-এর যে প্রদর্শনী প্রেসক্লাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে ইত্তেফাক-এ একটা বড় লেখা লিখেছিল সৈয়দ শামসুল হক। সেখানে আমাকে নিয়ে অনেকটা অংশ ছিল। হক লিখেছিল:
    ‘মুর্তজা বশীরের অধিকাংশ কাজ অয়েলে। বিভিন্ন মিডিয়মে সব মিলিয়ে তেত্রিশখানা ছবিতে এক অস্থির দুরন্ত শিল্পীর স্বাক্ষর আমরা দেখতে পেয়েছি। জাহাঙ্গীর (সৈয়দ জাহাঙ্গীর) যেখানে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন, কাইয়ুম (কাইয়ুম চৌধুরী) যখন আপাতত স্বল্পবাক, তখন বশীর এগিয়ে যাচ্ছেন দ্রুতগতিতে, ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ছেন, চালিয়ে যাচ্ছেন অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

    আমার কবিতার বই ত্রসরেণুর নামের মর্মোদ্ধারে অনেকেই হোঁচট খেলেও সৈয়দ শামসুল হক ঠিকই এর মূল্যায়ন করেছে, জানিয়েছে তার পাঠ প্রতিক্রিয়া।

    সৈয়দ হকের সঙ্গে দেশে-বিদেশে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত। তার গ্রিনরোডের বাসায় আমি গিয়েছি। মনে আছে, একবার তার বাসায় গিয়ে দেখি ওর মেয়ে বিদিতার প্রথম জন্মদিন। আমি সেদিন তার ছবি তুলেছিলাম, খুব আনন্দ হয়েছিল। ১৯৭৮-এ যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পথে লন্ডনে হক ও তার স্ত্রী আনোয়ারার সঙ্গে দেখা করে গেছি। সৈয়দ হকও আমার চট্টগ্রামের বাসায় এসেছে বহুবার। আমার স্ত্রীর রান্নাবান্নার কথা তার হৃৎকলমেরটানে বইয়ে আছে। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত শিশির দত্ত সম্পাদিত স্বনির্বাচিত নামের কবিতাসংকলনের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল যে সংকলনভুক্ত কবির কবিতার সঙ্গে তার স্কেচও থাকবে। তো সৈয়দ হকের স্কেচটি আমি করেছিলাম। একটা ফটোগ্রাফ অবলম্বনে করা ড্রয়িং আর কি!

    webnewsdesign.com

    এসব তো ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন যদি করতে হয়, সে ক্ষেত্রে আমি বলব, সে ছিল এই যুগের রবীন্দ্রনাথ। বিরল এক প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথ যা যা করেছেন, সৈয়দ হকও তা করেছে; সে বরং এক জায়গায় এগিয়ে—চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছে অনেক, যেটা রবীন্দ্রনাথ করেননি। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ অভিনয় করেছেন। আমাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ—সবকিছুতে সৈয়দ হকের সোনার হাতের ছোঁয়া লেগেছে। অথচ একটা অপ্রিয় সত্য হলো, বাঙালি মুসলমান তার নিজের মধ্যকার প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে জানে না। এ জন্য সৈয়দ শামসুল হকের যথার্থ মূল্যায়ন এখনো হয়নি।

    চলে যাওয়ার কয়েক বছর আগে তিনপয়সারজ্যোছনা নামে সে যে আত্মকথা লিখেছে, সেখানে আমাদের সবার কথা আছে, আর সবচেয়ে বেশি আছে ফজলে লোহানীর কথা। বিষয়টি আমার খুব মন ছুঁয়ে গেছে। কারণ, সে সময়ের আমরা সবাই তো লোহানীরই প্রডাক্ট। তখনকার দিনে চলনে-বলনে, চিন্তায়-লেখায় এমন আধুনিক মানুষ দ্বিতীয়টি ছিল না। কিন্তু আজকাল কেউ তাঁর নামটি পর্যন্ত নেয় না। হক যে ফজলে লোহানীর প্রতি তার ব্যক্তিগত ও আমাদের সমষ্টিগত ঋণ স্বীকার করেছে, এটি সত্যি ভালো লাগার বিষয়।

    সর্বশেষ তার সঙ্গে কথা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬-তে। পত্রিকায় অসুস্থতার খবর শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করি। কথা দিয়েছিলাম, আমি দেখতে যাব। হক ইউনাইটেড হাসপাতালের কেবিন নম্বরও আমাকে জানাল। কিন্তু দেখতে যাওয়ার আগেই সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল সে।

    সৈয়দ শামসুল হকের কথা বলতে গেলে শুধু তার কথাই বলা হয় না, আমাদের জীবনের ফেলে আসা ফাল্গুনবেলা সেই পঞ্চাশ দশকের কথা চায়ের আড্ডা, আঁকাআঁকি, লেখাজোখা, স্বপ্ন-সাধ—সবকিছু ফিরে ফিরে আসে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    সাহিত্য প্রেম

    ২৫ নভেম্বর ২০১৯

    পানি

    ১৭ আগস্ট ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
    “হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তীর মানুষ ধন্য, বর্ণ মালায় মেজর রফিক অনন্য”
    “হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তীর মানুষ ধন্য, বর্ণ মালায় মেজর রফিক অনন্য”