• শিরোনাম

    পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি

    | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

    পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি

    পর্যটন শিল্প বিকাশে এ দেশ পিছিয়ে পড়েছে কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে নানা ধরনের সমস্যা চোখের সামনে ভেসে আসবে। এর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যটন শিল্প বিকাশে অন্যতম এক প্রতিবন্ধকতা। রয়েছে অবকাঠামোগত অসুবিধা

    এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমিÑ হ্যাঁ, সত্যিই সকল দেশের রানী আমার এ জন্মভূমি। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা, রূপের মধু, সুরের জাদু ভরা আমার এ দেশ। নদীর কলতান, পাখির কলকাকলি, সবুজের সমারোহে পরিপূর্ণ আমার এ দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু রানীকে যেমন রানীর মতো যতেœ রাখতে হয়, সজ্জিত করতে হয় রাজকীয় বেশভূষায়, আমরা সেভাবে আমাদের এ দেশকে সাজাতে পারিনি। ধীরে ধীরে ধ্বংস করছি এ অপরূপার কোমল বদনখানি। গলাটিপে হত্যা করেছি নদীমাতৃক এ দেশের নদী, খালবিল। এত অযতœ আর অবহেলার পরও এ অপরূপ দেশ তার লাবণ্য ধরে রেখেছে প্রকৃতির অপার কৃপায়। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস।
    পর্যটন যে বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনাময় খাত, সেটাই আমরা বুঝতে চাই না। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া পর্যটন খাতে কতটুকু এগিয়েছে, তা আমরা সবাই জানি। একসময় এ দেশগুলো পর্যটক আনার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচার চালিয়েছে, বিনিয়োগ করেছে। এখন তারা এর সুফল পাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১২০ কিলোমিটারের সমুদ্রসৈকত আর ৬০০ বর্গকিলোমিটারের ম্যানগ্রোভ বন থাকার পরও বাংলাদেশ তার পর্যটনকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারছে না। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সাল নাগাদ এর সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬০ কোটি। এ বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। বাংলাদেশ যদি বিশাল এ বাজার ধরতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতি।
    আমরা দেখি, মানুষের কর্মময় জীবন যখন একঘেয়ে হয়ে ওঠে, তখন বের হয়ে পড়ে দূরে কোথাও। ঘুরে বেড়ায় ধরাবাঁধা একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে, বৈচিত্র্যের স্বাদ নিতে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষও পিছিয়ে নেই। তারাও ঘুরছে দেশ-বিদেশে। প্রতি সপ্তাহে কয়েক হাজার পর্যটক দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বছরে ১০ লাখের চেয়ে বেশি দেশীয় পর্যটক ভ্রমণ করছে দেশজুড়ে, সঙ্গে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণ করছে দেশের বাইরে। শুধু ভারতেই প্রতি বছর কয়েক লাখ বাংলাদেশী ভ্রমণ করে ট্যুরিস্ট ভিসায়। এ যে সুবিশাল পর্যটকগোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরেই রয়েছে, তাদের জন্য কোনো পরিকল্পনার কথা আজও শুনতে পাইনি। কিন্তু কেন? কারণ যথাযথ এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাব। অথচ বছরজুড়ে এ পর্যটকদের কারণেই টিকে থাকে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সার্ভিস প্রোভাইডাররা। অথচ এ পর্যটকরাই রয়ে যায় চরম উপেক্ষিত। বিদেশিরা আসুক বা না আসুক, অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলেই এ শিল্পটি নিজ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাবে। ১৬ কোটির বেশি মানুষের শতকরা অন্তত ১০ ভাগও যদি প্রতি বছর দেশের কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়, তাহলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা বিশাল হবে, সে হিসাব অর্থনীতিবিদরা সহজেই বের করতে পারবেন। তাছাড়া পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে অন্য যেসব ব্যবসা বিকাশ লাভ করে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিমান, যাত্রী পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যাংকিং, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর কোম্পানি, গাড়িভাড়া প্রতিষ্ঠান, নানারকম খুচরা পণ্যের দোকান ইত্যাদি।
    নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু আর প্রাচীন জনপদ হিসেবে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অনেক সম্পদই রয়েছে এ দেশে। রয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের মতো অবকাশ যাপনের উপযুক্ত স্থান। বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বনের অবস্থানও এ দেশে, তা-ও আবার সমুদ্রবেষ্টিত। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি তিন পার্বত্য জেলা। আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু, ঢেউতোলা সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে কালো পিচের সর্পিল রাস্তা দিয়ে পথ চলতে চলতে পাহাড়ের অপররূপ সৌন্দর্য যে কোনো পর্যটকের মন কাড়বে। আছে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, ময়নামতি বিহার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মনোমুগ্ধকর পাহাড়ের চা বাগান আর আদিবাসীদের বিচিত্র জীবনধারা। এশিয়ার অন্যতম রেইনফরেস্ট লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। জলারবন খ্যাত রাতারগুল, জল-পাথরের শয্যাখ্যাত বিছনাকান্দি। এছাড়াও আছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। আমাদের হাকালুকি হাওর এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরও আছে নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, সোনাদিয়া, পতেঙ্গা, মহেশখালী, পাহাড়পুর বিহার, শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, রানী ভবানীর কীর্তি, বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, গির্জা। আরও আছে ময়নামতি, রামসাগর, সোনারগাঁ, নাটোর রাজবাড়ী, দীঘাপাতিয়া জমিদারবাড়ি, তাজহাট জমিদারবাড়ি, ঢাকার লালবাগ দুর্গ, আহসান মঞ্জিল, গৌড় লক্ষ্মণাবতী শহর, বাগেরহাটের অযোধ্যা মঠ।
    আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ যেখানে এ শিল্পের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা অনেক পিছিয়ে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের ৭৫ শতাংশ, তাইওয়ানের ৬৫, হংকংয়ের ৫৫, ফিলিপাইনের ৫০, থাইল্যান্ডের ৩০ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। মালদ্বীপের অর্থনীতির বেশিরভাগ এবং মালয়েশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৭ শতাংশই আসে পর্যটন খাত থেকে। আর বাংলাদেশের ২ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। অথচ অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশের পর্যটন শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সম্ভাবনা অনেক বেশি।
    এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যটন শিল্প বিকাশে এ দেশ পিছিয়ে পড়েছে কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে নানা ধরনের সমস্যা চোখের সামনে ভেসে আসবে। এর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা পর্যটন শিল্প বিকাশে অন্যতম এক প্রতিবন্ধকতা। রয়েছে অবকাঠামোগত অসুবিধা। এছাড়া নিরাপত্তা নিয়েও পর্যটকরা উদ্বিগ্ন থাকেনÑ দিনের বেলা ফেরিওয়ালাদের উৎপাত, আর রাতে পতিতাদের। যেখানে-সেখানে ময়লা-আর্বজনার স্তূপ। পর্যটন স্পটে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য। যেখানে একটি আধালিটার পানির সর্বোচ্চ খুচরা দাম ১৫ টাকা, পর্যটন স্পটে সেটি কিনতে হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। সামুদ্রিক মাছের দামের কথা আর নাইবা বললাম। তাছাড়া এলাকায় ছোট যানবাহনের ভাড়া রাখা হচ্ছে ইচ্ছে মতো। নেই পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত বিনোদন ব্যবস্থা। আরও রয়েছে পর্যটন শিল্পের প্রচার ও প্রসারের জন্য সরকারি-বেসরকারি উভয়ের উদ্যোগের অভাব। এসব কারণে বাংলাদেশ এ শিল্পে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে আমি মনে করি।
    এসব সমস্যার মধ্যেও আশার কথা হলো, পর্যটন নিয়ে সরকারের আছে নতুন পরিকল্পনা। টেকনাফকে নিয়ে নতুন যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, এর নামকরণ করা হয়েছে ‘প্রিপারেশন অব ডেভেলপমেন্ট প্লান অব কক্সবাজার টাউন অ্যান্ড সিবিচ আপ টু টেকনাফ।’ এছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উত্তরণ, কক্সবাজার ও টেকনাফ পর্যন্ত ট্যুরিস্ট ট্রেন চালু, ইয়ানি বিচ থেকে টেকনাফ প?র্যন্ত ট্যুরিস্ট জোন গঠন। এছাড়া পর্যটন শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। পর্যটকদের আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত হোটেল-মোটেল গড়ে উঠছে। সরকার কক্সবাজারে একান্ত ট্যুরিস্ট জোন প্রকল্প, ট্যুরিস্ট পুলিশ বাহিনী গঠন করেছে। এছাড়া নতুন নতুন প্রকল্পের মধ্যে অবহেলিত কিন্তু ট্যুরিজম-বান্ধব প্রকল্পের মাধ্যমে ট্যুরিজম স্পট সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা পর্যটনের জন্য ইতিবাচক। পরিকল্পিত উপায়ে সেখানে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলা হলে আয় বাড়বে।
    বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশই এমন, একটু চেষ্টা করলে সারা দেশটাকেই পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তরা এগিয়ে এলে বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অগ্রগতি আসতে পারে। শুভ বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০১৭। শুভ হোক অপার সম্ভাবনার পর্যটন শিল্পের পথচলা। বিকশিত হোক আমাদের পর্যটন শিল্প। আমাদের দেশের রূপে বিমোহিত হোক বিশ্ববাসী। সবার আন্তরিক ও সার্বিক সহায়তায় আরও বিকশিত হবে আমাদের পর্যটন খাতÑ এটাই প্রত্যাশিত।

    মো. বশিরুল ইসলাম
    জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত)
    শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
    mbashirpro1986@gmail.com

    webnewsdesign.com

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    চাই নিরাপদ সড়ক

    ০৯ আগস্ট ২০১৮

    বাড়ছে কিশোর অপরাধ

    ২১ জানুয়ারি ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
    নৌকায় ভোট দিয়ে আবারও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে হবে — অধ্যাপক আবদুর রশিদ মজুমদার
    নৌকায় ভোট দিয়ে আবারও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে হবে — অধ্যাপক আবদুর রশিদ মজুমদার