অন্যান্য পেশার মত নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে চ্যালেঞ্জিং পেশা সাংবাদিকতায়ও। নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে এ পেশায় তারা এগিয়ে যাচ্ছেন পুরুষের সঙ্গে সমান তালে। বিশেষ করে দেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিকাশের পর সাংবাদিকতারয় নারীদের অবদান বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।

নারীদের সাংবাদিকতায় আসা, তাদের পেশাগত নিরাপত্তা, কর্মস্থলের পরিবেশ এবং এ পেশায় আসতে হলে থাকে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে আর কীভাবে নিজেকে তৈরি করতে হবে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় প্রেসক্লাবে নারীদের মধ্যে নির্বাচিত প্রথম সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন। সম্প্রতি চ্যানেল আই অনলাইনের ফেসবুক লাইভে তিনি এসব কথা বলেন।

তার মতে: এ পেশায় আসতে হলে মনে কোন সংশয় রাখা যাবে না। পেশাকে ভালোবাসতে হবে এবং তার এই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে যে, আমি এখানে টিকে থাকবো। এটা যাদের মধ্যে আছে তারাই এ পেশায় আসবে।

webnewsdesign.com

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নিজেকে এজন্য তৈরি করার অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন:  বড় কথা হলো যে, নিজেকে তৈরি করতে হবে। এ পেশায় আসলাম আর সাংবাদিক হয়ে গেলাম তা নয়; লক্ষ্য স্থির থাকতে হবে যে, আমি একটা জায়গায় পৌছবো। এজন্য নিজেকে তৈরি করার জন্য প্রচুর পড়াশোনাসহ যেভাবে নিজেকে তৈরি করা যায় সেসব কাজ করতে হবে।

নিজের জীবনের উদাহরণ টেনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এ শিক্ষার্থী বলেন: ক্লাসরুমে আমাদের শাহেদ কামাল স্যার বলতেন, তোমাদের তো চাকরি হবে না। কারণ তোমাদের কৌতুহল নাই। তিনি বলতেন, তোমাদের কৌতুহল থাকতে হবে, অনুসন্ধিৎসু মন থাকতে হবে। টিকে থাকার মানসিকতা থাকতে হবে। যে কেউ তোমাকে যে কোন প্রশ্ন করতে পারে। না পারলে বলবে তুমি কিসের সাংবাদিক। এজন্য তোমাকে জানতে হবে।

যারা সাংবাদিকতায় ভালো করেছেন বা কিংবদন্তী তূল্য তাদের গড়ে ওঠার পথ মসৃণ ছিল না উল্লেখ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রথম নারী সাধারণ সম্পাদক বলেন: আমাদের যারা পূর্বসূরীরা ছিলেন, যারা এ পেশায় ভালো করেছেন তারাও কিন্তু কেবল ভালোবেসেই থেকেছেন। তাদের অনেক অভাব, অনটন গেছে। এখনকার মত সাংবাদিকতায় এত জৌলুস ছিল না। এখনও আমাদের যারা নাম করা সাংবাদিক রয়েছেন, তারাও কিন্তু অনেক জটিল সময় পার করেছেন। তারা এ পেশাটাকে যতটা ভালোবেসেছেন, সংসারের কথাও তারা এতটা চিন্তা করেননি।

যে বিষয়ে অন্য পেশার মানুষরা না জানলেও চলে সে বিষয়েও ন্যূনতম ধারণা সাংবাদিকদের থাকতে হবে উল্লেখ করে ফরিদা ইয়াসমিন বলেন: সব বিষয়ই কিন্তু মানুষ সাংবাদিকদের কাছে জানতে চায়। ইতিহাস, অর্থনীতি বা যেকোন বিষয়। তাই সব বিষয় সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণা থাকতে হবে, বিশেষ করে সমসাময়িক কী ঘটছে সে সম্পর্কে চোখ, কান খোলা রাখতে হবে। অন্যরা না পারলে সমস্যা নেই, কিন্তু সাংবাদিকরা না জানলে সেটা সমস্যা।

দীর্ঘ ৩০ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফরিদা ইয়াসমিন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সাংবাদিতকায় নারীদের অবস্থান তুলে ধরে বলেন: আমার সময়ে যে ক’জন নারী সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন তারা অনেকেই টিকে থাকতে পারেননি নানা প্রতিকুলতার কারণে।

‘‘তবে এখন আমি বলবো এক্ষেত্রে একটা বিপ্লব হয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পর নারীদের অংশগ্রহণটা দৃশ্যমান হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পর অনেক নারী এখন এ পেশায় আসছেন এবং তারা সব ধরনের কাজ করছেন। মাঠে ঘাটে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানব সৃষ্ট দুর্যেগ যেকোন পরিস্থিতিতে তারা কিন্তু পিছপা হচ্ছেন না। তারা ছুটে যাচ্ছেন, রাত নাই দিন নাই তারা কাজ করছেন।

ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসায় মেয়েদের কাজ দৃশ্যমান হওয়ার পাশাপাশি অনেকের এ পেশার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন: আগেও মেয়েরা কাজ করেছে কিন্তু এখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পরে তা দৃশ্যমান হচ্ছে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পরেই কিন্তু মেয়েদের প্রতি একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে; মেয়েরা যে কাজ করতে পারে এই বিশ্বাসটা অন্যদের মাঝে তৈরি হয়েছে। তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও যে অনীহাটা ছিল সেটা দুর হয়েছে।

যেকোন পেশায়ই আত্মবিশ্বাসটা থাকতে হবে- আমি পারবো। এখন সাংবাদিকতা অন্য পেশার মত না, একটু আলাদা পেশা। যদি কারো মনে কোন ধরনের দোটানা থাকে এবং তিনি যদি নিরাপদ চাকরি চান তবে তার সাংবাদিকতায় না আসাই উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

‘আমি পারবো কি না এরকম চিন্তা যদি কারো থাকে তবে তার চলে যাওয়া উচিৎ বা আসাই উচিৎ নয়। এখানে অনেক সময় একটা অনিশ্চয়তা থাকতে পারে যে আজকে চাকরি আছে কালকে নাই। এরকমও হতে পারে যে মিডিয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা অন্য দশটা চাকরির মত নিশ্চিত চাকরি নয়। এখানে পেশাটাকে ভালোবাসলেই কেবল এ পেশায় আসা উচিত বা থাকা উচিৎ। আমি দুটো পয়সা কামাবো, আমি সাংবাদিক হবো- এ ধরনের চিন্তা থাকলে এ পেশা নয়, এরকম হলে ব্যাংকিং বা অন্য অনেক চাকরি আছে। একটা নিরাপদ চাকরি চাই- এরকম হলেও কিন্তু এ সাংবাদিকতাটা আসলে হবে না।’

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেলেও সাংবাদিকতায় নারীদের সম্ভাবনা দেখছেন এ পেশায় অন্যতম সফল এ নারী। তার মতে, মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে, আরও এগিয়ে যাবে। তবে একটু সময় লাগবে। কারণ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এখনও মেয়েদের কাজকে… অনেক সময় তাদের নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

‘এ পেশায় নারীদের সম্ভাবনা দেখছি। আমাদের সমাজ বা অনেক উন্নত সমাজই বা কি। গতকাল আমাদের জাতীয় প্রেসক্লাবে ভয়েজ অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া এসেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, এটা তো বাংলাদেশের সমাজ, অনেক পশ্চাৎপদ। কিন্তু আমাদের আমেরিকাতেও আমাকে এ ধরনের একটি পদে আসতে ৩০ বছর লেগেছে। যে কথাটা তিনি আমাকে বলেছেন যে, আমি জানি এ পদে আসতে আমার যতটা সময় লেগেছে, একজন পুরুষের এতটা সময় লাগতো না…আসলে সমাজটাই এরকম (নারীদের জন্য)। আশা করি পরিবর্তন আসবে।’

তবে এসব পরিবর্তন তখনই সম্ভব যখন রাস্তায়, কর্মস্থলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আর এ দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, পরিবার সবাইকেই নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।