• শিরোনাম

    দুরন্ত শৈশব ও প্রকৃতির আলিঙ্গন

    | ১৭ জানুয়ারি ২০১৮ | ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ

    দুরন্ত শৈশব ও প্রকৃতির আলিঙ্গন

    সময়ের চোরাবালি

    দুরন্ত শৈশব ও প্রকৃতির আলিঙ্গন

    এস এম মুকুল

    আমরা বোধহয় ভুলেই গেছি, শৈশব মানেই দুরন্তপনা। শৈশব মানেই স্মৃতি ও স্বপ্ন-জাগানিয়া সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাটানো সময়। সেই শৈশবের দুরন্তপনা আর প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে সরে যাচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। তাই নতুন প্রজন্মের জীবনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব। সস্তা প্রতিযোগিতাশীল বিবেক-বোধহীন পরিবেশে বড় হচ্ছে আমাদের শিশুরা। ইট, কংক্রিটের ফ্ল্যাট কালচারের আড়ালে শিশুরা ঠিকই বড় হচ্ছে—তবে তারা পাচ্ছে না সোনালি রোদের আলো, বর্ণিল মেঘের ছায়া, রংধনুর আলোর ঝলকানি অথবা নির্মল দামাল বাতাসের দমকা! চার দেয়ালের ভেতর তার জন্য সব বন্দিত্বের আয়োজন! টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ভিডিও গেম আর মোবাইল গেম রীতিমতো ভূতের বোঝা হয়ে চেপেছে শিশুদের মনে। ডরিমন, পকিমন আর শিশুদের বেকুব বানানোর জন্য স্টার জলসার কিছু আয়োজন গিলে খাচ্ছে শিশুদের স্বপ্নবিলাস।

    এখন অনেক বাবা-মায়ের অভিযোগ ডরিমন, পকিমন নিয়ে। অভিযোগ ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান নিয়ে। শিশুরা এখন অকপটে যেসব হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শিখছে, যা শুনে বাবা-মায়েরা শুনে বোকা বনে যাচ্ছেন। তারা নিজেরাও জানে না এসব ভাষার মানে কী। যে শিশুটি ঠিকমতো বাংলা বলতে শিখেনি—সে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করছে ভিনদেশি ভাষা হিন্দি! এখনো আমাদের টনক নড়ছে না!! অথচ টিভি অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরুদ্ধে দাবি তুলেছে ভারতীয় বাবা-মায়েরা।

    অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অব ইন্ডিয়ার এক জরিপে জানা যায়, টিভি অনুষ্ঠানে লাগামহীন যৌনতা ও সহিংসতা প্রদর্শনে রাশ টানতে একটি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ চায় ৬৩ শতাংশ ভারতীয় বাবা-মা। জরিপের ফলাফলে দেখানো হয়—শিশুদের ১০ শতাংশ সহিংস আচরণের জন্য টিভি অনুষ্ঠানের চমৎকার প্রদর্শন দায়ী। জরিপে ৭৬ শতাংশ বাবা-মা বিশ্বাস করে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের কারণেই চার থেকে আট বছর বয়সী শিশুরা অভিভাবকদের শ্রদ্ধা করে না। এই হলো ভারতে অবস্থা। ভারতের আগ্রাসী প্রভাব এখন আমাদের দেশেও পড়তে শুরু করেছে।

    webnewsdesign.com

    ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, দাদা-দাদি, নানা-নানির সাহচর্য শিশুদের দীর্ঘজীবী করে। এখন দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি বা মামার বাড়ি বেড়ানো উচ্ছ্বাস শিশুদের জীবনে নেই। শহুরে শিশুরা নদী দেখে না, সাঁতার জানে না। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো অসাধারণ রোমাঞ্চকর সাহসিকা তাদের জীবনে ঘটে না! কারণ, পারিবারিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। শিশুরা পাচ্ছে না যৌথ পারিবারিক বন্ধনের আনন্দমুখরতা। বিচ্ছিন্ন, ছন্নছাড়া পরিবারগুলোর মধ্যে নিরানন্দ বিষণ্নতায় শৈশব কাটছে। স্কুলের হোমওয়ার্ক, গৃহশিক্ষকের পড়া, তারপর বাবা-মায়ের স্বপ্নপূরণে সন্তানদের ওপর চাপিয়ে নাচ, গান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার চাপে শিশুদের মধ্যে অস্বস্তি আর অস্থিরতা বাড়ছে। নিরানন্দ জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ শিশুরা। অভিভাবকরাও বুঝতে চায় না যে শিশুর জন্য কখন কী প্রয়োজন। শিশুমন কখন কী চায়, তার কী প্রয়োজন তা না বুঝেই তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বাবা-মায়ের ইচ্ছা।


    দাদা-দাদি, নানা-নানির সাহচর্য শিশুদের দীর্ঘজীবী করে। এখন দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি বা মামার বাড়ি বেড়ানো উচ্ছ্বাস শিশুদের জীবনে নেই। শহুরে শিশুরা নদী দেখে না, সাঁতার জানে না। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো অসাধারণ রোমাঞ্চকর সাহসিকা তাদের জীবনে ঘটে না! কারণ, পারিবারিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে…


    ব্রিটেনভিত্তিক দাতব্য সংস্থা রয়েল সোসাইটির এক জরিপে জানা যায়, ব্রিটেনে ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়স্ক মানুষের কোনো সোনালি শৈশব নেই! প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো অকৃত্রিম অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে ঘটেনি! জরিপে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন—সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুজীবনে প্রকৃতিবান্ধব অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের শিশুরা প্রকৃতির আলিঙ্গন কী পাচ্ছে? নগরসভ্যতা যেন সমৃদ্ধ শৈশবের সব আয়োজনকে গো-গ্রাসে গিলে ফেলছে। আর ব্যবস্থার নামে অভিভাবকরাও শিশুদের বায়না মেটাচ্ছেন কৃত্রিম আয়োজনে! এভাবে কী শিখবে আমাদের শিশুরা? মনোবিজ্ঞানী ডা. মেহতাব খানম বলেছেন, শিশুদের জন্য উপযোগী এবং সঠিক জীবন চর্চাই হচ্ছে না। এখন আমাদের পরিবারগুলোয় শ্রদ্ধা, স্নেহ-মমতা, সহিষ্ণুতা ও শর্তহীন ভালোবাসার চর্চা নেই। সবাই স্বার্থপরের মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। আগে পরিবারে একে অপরের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিত। পরিবারগুলো ছিল বাবা-মা, দাদা-দাদিকেন্দ্রিক। গ্রামের সঙ্গে ছিল নিবিড় সম্পর্ক। বছরে দুই ঈদ ছাড়াও ধান কাটার মৌসুম, শীতের পিঠা-পায়েস উৎসব, বর্ষা ও আম-কাঁঠালের উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে যাওয়া হতো। ফলে শিশুরা পারিবারিক সম্প্রীতির পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্য ও প্রকৃতির আলিঙ্গন পেত। এখন আধুনিকতার নামে কৃত্তিমতা এসে গ্রাস করেছে আমাদের চিন্তা, চেতনা ও রুচিবোধে। কথা হলো এই সমাজে কী করে বোধসম্পন্ন নাগরিকের জন্ম হবে?

    বাবা-মায়েরা এখন অতি সচেতনার নামে তুলোতে করে সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে বোধহীন বেকুব হিসেবে গড়ে তুলছে! এটা করো-না, ওটা করো-না কত রকম বাধা-বিপত্তি শিশুর জন্য! শিশুদের প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। প্লে-ইংল্যান্ড নামের একটি সংগঠন বলেছে, শিশুদের গাছে ওঠা বা সাইকেল চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ খেলাগুলোয় উৎসাহিত করা উচিত। তাতে একটু-আধটু ব্যথা পেলে বা কেটে-চিড়ে গেলেও ক্ষতি নেই। সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে শিখবে। বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে বুঝবে। আরো বুঝবে, যেকোনো কিছু অর্জন করা অত সহজ নয়। সবকিছুই কষ্ট করে অর্জন করতে হয়। আমরা করছি তার উল্টোটা। অভিভাবকেরা সন্তানদের অনেক চাহিদা নগদ টাকা এবং জিনিসপত্র দেওয়ার মাধ্যমে পূরণ করে থাকি। এ কারণে এসব বিষয় তাদের কাছে খুব সহজলভ্য মনে হয়। চাহিবামাত্র অনেক দামি একটা জিনিস সহজে পেয়ে যাওয়াার কারণে এটা তার কাছে যেমন খুব মূল্যবান কিছু মনে হয় না, তেমনি পরবর্তী বায়না পূরণে তার কোনো বিলম্বও সয়না! বরং তার অস্থিরতা বাড়ে। এসব কারণে সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে শিশুর মানসিক চাহিদা কী। সে কী চায়, কেন চায়।

    উন্নত দেশগুলোয় শিশুদের স্কুল এবং শিক্ষা পদ্ধতি আনন্দদায়ক। শিক্ষকরা বন্ধুসুলভ। ওখানকার স্কুলে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘প্রবলেম সলভিং স্কিল বা সমস্যা সমাধানের পারঙ্গমতা’ শেখানো হয়। সেখানে শিক্ষকরা এমনভাবে শেখায় যার ফলে শিক্ষার্থীকে আর প্রাইভেট বা কোচিং করতে হয় না। সেখানে অনেক স্কুলের আঙ্গিনায় বাচ্চাদের দিয়ে ফুলের ও সবজির বাগান করানো হয়। সে বাগানের সবজি দিয়ে স্কুলে টিফিন খাওয়ানো হয়। এবার ভাবুন আমাদের দেশে শিশুরা এতসব জাঁতাকলের চাপে কী করে সুস্থ আছে সেটাই আশ্চর্যের বিষয় নয় কী? শিশুদের জন্য প্রয়োজন সমৃদ্ধ সোনালি শৈশব। আর এজন্য আমরা আর কী কী করতে পারি—

    শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে একান্ত কিছু সময় কাটানো। পারিবারিক আলোচনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও তাদের স্বপ্নের কথা জানানো। সন্তানের খোঁজখবর নেওয়া। সন্তানের স্বপ্ন বা ইচ্ছের কথা জানা। পারিবারিক আত্মীয়স্বজনের কাছে নিয়ে যাওয়া। স্বজনদের উপলক্ষে আয়োজনে একত্র করা। স্বজনদের খোশগল্প সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা। সপ্তাহে অন্তত একদিন সপরিবারে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। হতে পারে কোনো বিনোদন পার্ক, কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশ। নিদেনপক্ষে আত্মীয়ের বাড়ি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া, আড্ডা দেওয়া, নাটক, সিনেমা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখা। সন্তানদের দাদা-দাদি, নানা-নানির গল্প শুনানো। নিজেদের ছেলেবেলার গল্প শুনানো। গ্রামের বাড়ির গল্প শুনানো। বছরে অন্তত দু-একবার সাধ্যমতো ভ্রমণে যাওয়া। হতে পারে পাহাড়ি অঞ্চল সিলেট, বান্দরবন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, কুয়াকাটা, হাওড়াঞ্চল—সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা। অথবা কোনো পর্যটন এলাকায়। আম-কাঁঠালের মৌসুমে, শীতের পিঠা-পায়েসের উৎসবে, ফসল তোলার মৌসুমে সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া।

    সন্তানদের সাঁতার শেখানো, গাছে চড়তে শেখানো, সাইকেল চালাতে শেখানো, পাঠাগারে পাঠানো, গল্পের বই কিনে দেওয়া, বিশেষ দিবসে বই উপহার দেওয়া। শহরে অনুষ্ঠিত বইমেলা, পিঠামেলা, বৃক্ষমেলা, বর্ষা উৎসব, থিয়েটার নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া। হাটে-বাজারে নিয়ে যাওয়া, বাজার করতে শেখানো এসবই আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ বিষয়। সন্তানদের অন্যান্য সহপাঠী-প্রতিবেশী ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া। তবে তারা কার সঙ্গে মিশে কী শিখছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। সন্তানদের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। মূলত পারিবারিক আলোচনায় সন্তানদের সম্পৃক্ত করলেই এসব বিষয়ে ধারণা পাবে তারা। মনে রাখা দরকার, আমরা অনেকেই পিতা-মাতা হিসেবে সন্তানদের কাছে আদর্শের মডেল হতে পারছি না। সবার আগে এ কাজটি করা জরুরি।

    লেখক : সমাজবিশ্লেষক ও কলামিস্ট
    writetomukul36@gmail.com

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    চাঁদপুরসহ ২২ জেলায় নতুন ডিসি

    ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

    ভূয়া কবিরাজের কারিশমা‘

    ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
    ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, কচুয়া, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, সদর, ফরিদগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাচন
    ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, কচুয়া, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, সদর, ফরিদগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাচন