• শিরোনাম

    দাফন ও সৎকার নিয়ে জটিলতার অবসান হবে?

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৪ জুন ২০২০ | ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ

    দাফন ও সৎকার নিয়ে জটিলতার অবসান হবে?

    ১. দিনাজপুরের বীরগঞ্জে হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টে মারা যাওয়া এক যুবকের দাফনে বাধা দিয়েছে স্থানীয়রা। অবশেষে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

    ২. ঠাকুরগাঁওয়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া গৃহবধূর মরদেহ শ্বশুর বাড়ি ও বাবার বাড়ি উভয় গ্রামের কবরস্থানে দাফনে বাধা দিয়েছে গ্রামবাসী। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে বাবার বাড়ির কাছে সদর উপজেলার কশালবাড়ি গ্রামের এক ইউপি সদস্যের জমিতে ওই গৃহবধূর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

    ৩. কুমিল্লার লাকসামে প্রথম একজন করোনা রোগীর মৃত্যু হলে তাকে তার স্বজনরা যাতে গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে না পারে, সেজন্য গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় স্থানীয়রা। পুলিশ গিয়ে ব্যারিকেড তুলে নেয়। প্রশাসনের উদ্যোগে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

    webnewsdesign.com

    ৪. করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে তাকে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থানে দাফন করতে দিচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। এই কবরস্থানের লোহার গেটের ওপরে একটি ব্যানারও টাঙানো হয়েছে। এর আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীতে করোনায় মৃতদের এই কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।

    এগুলো সাম্প্রতিক কয়েকটি সংবাদ। ইন্টারনেটে খুঁজলে এরকম আরও অনেক খবর পাওয়া যাবে।

    দেশে করোনায় মৃত্যুর খবর আসার সাথে সাথে নিয়মিত বিরতিতে মৃতদেহ দাফন ও সৎকারে বাধা দেয়ার এই সংবাদগুলোও গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। শুধু তাই নয়, করোনা বা করোনার উপসর্গে মারা যায় প্রিয়জনকে ফেলে চলে যাওয়া বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়ির সিঁড়িতে মরদেহ পড়ে থাকার মতো ভয়াবহ অমানবিক ঘটনাও গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে।

    বস্তুত করোনা নামক এই ভাইরাসটি এসে একদিকে যেমন আমাদের চিকিৎসা খাতের চরম অব্যবস্থাপনা আর দুর্বলতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, তেমনি আমাদের অনেকের ভেতরের পাশবিক শক্তিগুলোও যেন জাগিয়ে দিয়েছে। যে বাবা মা কষ্ট করে সন্তান লালন-পালন করলেন, বড় করলেন, সেই সন্তান করোনার ভয়ে বাবা মাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। যে পুরুষ সারা জীবন স্ত্রী সন্তানের জন্য গাধার মতো খাটলেন, মৃত্যুর পরে তিনি বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকলেন। কেউ কাছে গেল না।…

    সামান্য এক ভাইরাসে এত ভয়!
    করোনা অথবা করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃতদের দাফন নিয়ে জটিলতার জন্য প্রধানত দায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই। কারণ তারাই বিষয়টি পরিস্কার করতে পারেনি যে মৃতদেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায় কি ছড়ায় না। ফলে দাফন ও সৎকার নিয়ে মৃতদের স্বজনরাও ভীত হয়ে পড়েন। তার সাথে যুক্ত হয় সেইসব অতি উৎসাহী লোক, যারা কোনো বাড়িতে করোনা রোগীর সন্ধান পাওয়া গেলে সেই বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। যেন রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব তাদের দেয়া হয়েছে। এই অতি উৎসাহী লোকেরা তথাকথিত লকডাউনের নামে বিভিন্ন স্থানে বাঁশ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাটও আটকে দিয়েছে। এতে করে জরুরি প্রয়োজনে এনকি রোগীদের বহনের জন্য গাড়ি ঢুকতে পারছে না, এরকম খবরও এসেছে। এইসব অতি উৎসাহীদের মধ্যে অনেকেই যেহেতু স্থানীয়ভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, ফলে তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ কোনো কথা বলার সাহসও পায়নি।

    এত্ক্ষণে অরিন্দম!
    করোনা ইস্যুতে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেসব নির্দেশনা বা পরামর্শ দেয়, সেগুলো মূলত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রাপ্ত। ফলে তারাও শুরুর দিকে করোনা এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃতদেহর দাফন ও সৎকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বিষয়টি পরিস্কার করা হয়েছে যে, মৃতদেহ থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায় না এবং মৃতদেহর দাফনের জন্য আলাদা জায়গার প্রয়োজন নেই, বরং পারিবারিক কবরস্থানেই তাদের দাফন করা যাবে। বোঝাই যাচ্ছে, পরপর অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যাটি আরও আগেই আসা উচিত ছিল।

    দেরিতে হলেও এই নির্দেশনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও বলেছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্য বডি ব্যাগ না পাওয়া গেলে পলিথিনে মুড়িয়েও তাকে দাফন কাজ করা যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাতে সরকারের তরফে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃতদের দাফ ও সৎকারে যেহেতু ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লেগে যায়, তাই এত সময় ভাইরাসের কর্মক্ষমতা থাকে না। ফলে অন্য কারো শরীরে এটি ছড়ানোর কোনো শঙ্কা থাকে না।

    তবে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃতহেদ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালন; মৃতদেহ স্পর্শ না করা; মৃতদেহ ময়নাতদন্ত না করা; দাফনের আগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির সুরক্ষা পোশাক পরে এবং জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া মেনে মুখের লালার নমুনা সংগ্রহ করা; অনিয়ন্ত্রিতভাবে মৃতদেহ পরিষ্কার বা না ধোয়া; মৃতদেহ বহনকারী ব্যাগটি না খোলার নির্দেশনা রয়েছে।

    মানুষ কী করবে?
    প্রশ্ন হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই নির্দেশনার পরেই কি পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যাবে? হয়তো অনেক জায়গায়ই অতি উৎসাহী এবং স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী লোক করোনা অথবা করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন ও সৎকারে বাধা দেবেন। অনেককে হয়তো পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হবে। এ ব্যাপারে সামাজিকভাবেও জনমত গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে যে, করোনা বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন বা সৎকারের জন্য আলাদা স্থানের প্রয়োজন নেই। বরং পারিবারিক কবরস্থানেই দাফন এবং মৃতের স্বজনদের পছন্দ মতো শ্মশানে সৎকার করা যাবে। আর যেহেতু মৃতদেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায় না, অতএব নির্ভয়ে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে জানাজা-দাফন-সৎকারসহ অন্যান্য কাজ করা যাবে, এই বার্তাটিও তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া জরুরি—যাতে মৃতদেহ দাফন ও সৎকার নিয়ে আর একটিও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর না আসে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
    বোকরা নিষিদ্ধ! হাজীগঞ্জে বোরকা পরার অপরাধে আধাঁঘন্টা খাতা আটক রাখার অভিযোগ
    বোকরা নিষিদ্ধ! হাজীগঞ্জে বোরকা পরার অপরাধে আধাঁঘন্টা খাতা আটক রাখার অভিযোগ