• শিরোনাম

    জলবায়ু পরিবর্তন : উন্নত বিশ্বকেই দায় নিতে হবে

    | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭:৩৬ অপরাহ্ণ

    জলবায়ু পরিবর্তন : উন্নত বিশ্বকেই দায় নিতে হবে

    পুঁজিবাদী শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আর এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে, যাদের কার্বন নিঃসরণের যে মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে কম কার্বন নির্গত করে থাকে

    পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে। বরফ গলে যাচ্ছে। ঝড়ঝাপটা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এ সবকিছু ঘটছে। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার কারণেই জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। সারা বিশ্বই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকি এবং তার প্রভাবের মধ্যে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসকে দায়ী করা হচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাস বলতে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ওজোন, ফ্লোরিনেটেড গ্যাস ইত্যাদি বোঝানো হয়ে থাকে। সূর্য থেকে নির্গত আলোক রশ্মি (সাধারণত ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট আলোক রশ্মি) গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠে আপতিত হয়। আপতিত আলোক শক্তির কিছু অংশ মহাশূন্যের দিকে ফেরত যাওয়ার সময় গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড কর্তৃক শোষিত হয়। প্রকৃতপক্ষে গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীর উষ্ণতার জন্য দায়ী নয়, বরং তার মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ উপস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। ঐতিহাসিকভাবেই এর জন্য দায়ী উন্নত বিশ্ব। শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর চারিদিকে যে বলয় আছে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন জমা করেছে তারা। শিল্প বিপ্লব শুরুর আগে বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইডের যে মাত্রা ছিল, বর্তমানে মাত্রা তার চেয়ে প্রায় ১৪২ শতাংশ বেশি রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিছু উন্নয়নশীল দেশ, যারা দ্রুত শিল্পায়িত হচ্ছে, তারাও বায়ুম-লে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে। অন্য দেশগুলোও নিঃসরণ করছে। পৃথিবীর বলয়ে প্রতিনিয়ত বেশি বেশি গ্যাস জমা হচ্ছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। চীন প্রায় ৩০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুম-লে নিঃসরণ করছে, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭ শতাংশের উপরে নিঃসরণ করছে। বিশ্বে এ দুইটি দেশই সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করছে। এরাই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ী।
    জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাত আছে। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘন ঘন হানা দিচ্ছে। প্রকৃতির গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন আসছে। শীতের সময় ঠিকমতো শীত পড়ছে না। বর্ষাকালে বৃষ্টি হচ্ছে না। আবার বৃষ্টি শুরু হলে আষাঢ়, শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র মাসেও থামছে না। ভাদ্রমাসে কী তাল পাকা গরম হবে, উল্টো বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা আর বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আবার এক অঞ্চলে খরা হলেও অন্য অঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছে। চিরচেনা প্রকৃতি বড়ই অচেনা হয়ে যাচ্ছে।
    ব্রাজিলের রিও ডি জিনেরিওতে ১৯৯২ সালে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক পরিস্থিতির বিচার, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং বিশ্বের দেশগুলোর করণীয় নিয়ে বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলন ‘আর্থ সম্মেলন’ নামে পরিচিত। এ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন গৃহীত হয়, যা ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (টঘঋঈঈঈ) নামে পরিচিতি লাভ করে। এ সম্মেলনের ফলোআপ হিসেবে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর কনফারেন্স অব পার্টিজ বা ঈঙচ নামে সম্মেলন হয়ে আসছে। কার্বন নির্গমন হ্রাস করার জন্য, পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী করার জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে ১১ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকল গৃহীত হয়। ওই প্রটোকলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ১৯৯০ সালে যা ছিল, ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তা ৫ শতাংশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে ২০১২ সালে দোহা সম্মেলনে সংশোধিত প্রটোকল-২০২০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। প্রথম দিকে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার কমানোর ওপর আলোচনা হলেও হালে তাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও মানুষের জন্য কী করা যায়, কীভাবে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বা অভিযোজনের ব্যবস্থা করা যায়Ñ এসব নিয়ে আলোচনা করা হয়। ফলে বাংলাদেশ আলোচনার সামনে চলে আসে।
    জলবায়ু পরিবর্তনের দুইটা নিয়ামক বা দিক রয়েছেÑ মনুষ্যসৃষ্ট আবহাওয়া পরিবর্তন এবং পৃথিবীর নিজস্ব নিয়মে জলবায়ু পরিবর্তন। দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অপরিকল্পিতভাবে ভূমির ব্যবহার, ওজোনস্তরের ক্ষয়, বনভূমি উজাড়করণের মতো মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলো শুধু উপরিভাগের জলবায়ুর ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং জলবায়ুজনিত কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা ক্ষুদ্র অঞ্চলগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কনফারেন্স কপ-২১ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পেছনে যে কারণগুলো কাজ করে, তার জন্য কাজ করার নিমিত্তে একটি সমঝোতা হয়। প্যারিসের লো বুর্জে নভেম্বরে শুরু হয় এ সম্মেলন। প্যারিস চুক্তির খসড়ায় সম্মতি দেয় ১৯৫টি দেশ। ওই সম্মেলনে যত দ্রুত সম্ভব কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর বিষয়টি ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের ওপর বেশি নির্ভর করে। কারণ আগেই দেখানো হয়েছে, এ দুই দেশ সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। কপ-২২ সম্মেলন, যা মরক্কোর মারাকাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে ২০১৬ সালকে ১৮৮০ সালের পর সবচেয়ে উষ্ণ সাল হিসেবে অভিহিত করা হয়। বলা হচ্ছে, ১৮৮০ সালের আগের তাপমাত্রার রেকর্ড নেই। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানান, বায়ুম-লে ক্রমে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে চলছে, ২০১৫ সালে বায়ুম-লে এ গ্যাসের পরিমাণ ৪০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)।
    বৈশ্বিক উষ্ণতাকে ঘিরে যখন বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবে। প্যারিস চুক্তি নাকি আমেরিকার জনগণের ওপর বোঝা বাড়াবে। অবশ্য ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাকে স্রেফ গুজব বলে অভিহিত করেন। তিনি সে সময়ই ‘আমেরিকার শ্রমিকদের সবার আগে রাখার’ জন্য প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, প্যারিস চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮৭টি দেশ মিলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছিল। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাধা এবং অসুবিধা তৈরি করছে। এ চুক্তির ফলে মার্কিন মুলুকের জিডিপিতে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি এবং ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। তিনি আরেকটি জলবায়ু চুক্তির প্রস্তাব করেছেন, নতুন শর্ত যুক্ত করে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ন্যায্য হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এরূপ সিদ্ধান্তের কারণে ইউএন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদা বন্ধ হয়ে গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
    জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর পেছনে কিছু কারণও আছে। বাংলাদেশ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা তিনটি বড় নদীর অববাহিকার নিম্নাংশে অবস্থিত একটি বদ্বীপ। দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উত্তরের জেলা দিনাজপুরের উচ্চতা ৪২ মিটার আর পঞ্চগড়ের উচ্চতা ৭৯ মিটার। এখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে বন্যা দেখা দেয়। উপর থেকে পানি নিচের দিকে আসে। আবার শুষ্ক মৌসুমে খরার দেখা মেলে। কারণ পানির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই, নিয়ন্ত্রণ উপরে। তিস্তা চুক্তি হচ্ছে হচ্ছে করে হচ্ছে না। টালবাহানা চলছে। বাংলাদেশের রয়েছে প্রায় ৭১০ কিলোমিটারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত বা উপকূলীয় এলাকা। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলে পানিতে পরিণত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করছে। আবার তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে পানির অণুর আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সমুদ্র ফুলে উঠছে। উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আমাদের উপকূলীয় এলাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বসবাস। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঝড়-বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে এ মানুষগুলো বেশি আক্রান্ত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কৃষি জমিতে প্রবেশ করায় ফসল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে; দেখা দিতে পারে খাদ্যের সমস্যা। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু এবং মোরার কথা কার মনে নেই। দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদীসংশ্লিষ্ট এলাকায় যেসব লোকজন বসবাস করেন, তারাও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উদ্বাস্তু মানুষে পরিণত হচ্ছেন। তাদের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বন্যা হচ্ছে, পাড় ভেঙে যাচ্ছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো ভাঙনপ্রবণ নদী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নদী তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করায় নদীশিকোস্তি মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিক্স ইনডেক্স অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই বাংলাদেশের নাম রয়েছে। বিশ্বব্যাপী গবেষকরা সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ততার বিচারে বাংলাদেশকে ‘পোস্টার চাইল্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।
    পুঁজিবাদী শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আর এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে, যাদের কার্বন নিঃসরণের যে মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে কম কার্বন নির্গত করে থাকে। অন্যের নির্গত কার্বনের ভারে আমরা নতজানু।
    জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুধু বাংলাদেশের অবস্থাই যে খারাপ হচ্ছে তা নয়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর সব দেশেই তার প্রভাব পড়ছে। ফিলিপাইন বারবার হারিকেন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্লোরিডার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হারিকেন ‘ইরমা’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের বড় একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ক্যারিবীয় দ্বীপ ডমিনিকায় ঘূর্ণিঝড় ‘মারিয়া’ আঘাত হানায় প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্ট স্কেরিটের বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে। উন্নত বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতগুলোর সঙ্গে অভিযোজন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা আছে। তাদের উন্নত প্রযুক্তি আছে। জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বসতি এলাকা ইত্যাদি তারা দ্রুত ঠিকঠাক করে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ফিরে আনতে পারেন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের আর্থিক সক্ষমতা কম হওয়ায়, প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা ততটা উন্নত না হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলা করার শক্তি কম। সময় লাগে। একটি বড় বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলে অনেক কষ্ট করে দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠে যাওয়া মানুষগুলো সবকিছু হারিয়ে আবার দরিদ্র হয়ে পড়ে। দরিদ্ররা অতিদরিদ্র, আর অতিদরিদ্র মানুষগুলো নিঃস্ব হয়ে যায়। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের অর্থনীতিকে অনেকখানি পিছিয়ে দেয়। অবশ্য বাংলাদেশ নিজস্ব আর্থিক সম্পদ দিয়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে; কিন্তু এ ফান্ড অভিঘাত মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
    বর্তমান বিশ্ব সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। এসডিজির ১৭টি গোলের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলাসংক্রান্ত গোল বা লক্ষ্যটি বেশ গুরুত্বসহকারে আলোচনা হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে শিল্প-কারখানা, যানবাহন ব্যবস্থা, অধিক জনসংখ্যা, বন উজাড়করণ ইত্যাদি কারণে বায়ুম-লের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রায় প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালে বাংলাদেশে যেসব অভিঘাতের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, সেটা শঙ্কিত হওয়ার মতো। সংস্থাটি বলেছে, নানা প্রতিষেধক ও প্রতিরোধ আবিষ্কারের পরও ওই সময় এ দেশে পানি ও মশাবাহিত কিছু রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে। অভিঘাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে থাকবে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট নানা রোগ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনায় এ অঞ্চলের বিগত বছরগুলোর উন্নয়নকে পিছিয়ে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করা না গেলে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগোচ্ছি, সেটা অর্জন স্বভাবতই কঠিন হবে।
    অবশ্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ কার্বন নিঃসরণ কমাতে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে তুলনায় বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো।
    পরিশেষে একটা কথা বলা দরকার, মার্কিন প্রশাসন প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা দেয়ায় তারা মূলত পৃথিবীর ‘ভবিষ্যৎ সময়’কে অস্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টারের (এনএইচসি) তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোরিডার ওপর যখন হারিকেন ‘ইরমা’ ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, ঠিক তখনই ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, আপনারা স্বচক্ষেই জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন এবং আমাদের কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটি বিজ্ঞানীরা খুবই স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন আমলে না নিলে মানবজাতির পতন ঘটবে। এর পরে আর কিছু বলার থাকে বলে মনে হয় না।

    খন্দকার রাহাত মাহমুদ
    ব্যাংকার ও কলাম লেখক
    champookgm@gmail.com

    webnewsdesign.com

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    বাড়ছে কিশোর অপরাধ

    ২১ জানুয়ারি ২০১৮

    চাই নিরাপদ সড়ক

    ০৯ আগস্ট ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
    নৌকায় ভোট দিয়ে আবারও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে হবে — অধ্যাপক আবদুর রশিদ মজুমদার
    নৌকায় ভোট দিয়ে আবারও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে হবে — অধ্যাপক আবদুর রশিদ মজুমদার