• শিরোনাম

    কারো কথাই মানছে না মিয়ানমার

    | ১৮ অক্টোবর ২০১৭ | ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ

    কারো কথাই মানছে না মিয়ানমার

    পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সেনাপ্রধান ও সু চির

    কারো কথাই মানছে না মিয়ানমার

    নিজস্ব প্রতিবেদক্।

    রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কারো কথায় মানছে না মিয়ানমার। ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো সদিচ্ছাই প্রকাশ পাচ্ছে না দেশটির। মুখে মুখে নানা আলোচনার কথা বললেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এখনো পর্যন্ত আন্তরিকতার ন্যূনতম কোনো প্রকাশ ঘটায়নি। উল্টো আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সময়ক্ষেপণের কৌশলেই হাঁটছে। নিজেদের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখতে চীন ও রাশিয়াসহ পক্ষের দেশগুলোতে কূটনীতি অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।

    কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি চেষ্টা করবে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে ও বড় ধরনের কোনো বিধিনিষেধ আরোপ ঠেকাতে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া এখনো দেশটির পক্ষে থাকায় এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই দুই দেশ বারবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিরোধিতা করায় সংকট সমাধানে দেশটির সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।

    webnewsdesign.com

    মিয়ানমার যে সংকট সমাধানে আন্তরিক নয়, তার প্রমাণ হিসেবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার মন্ত্রীর বৈঠকের দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। এখনো ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনে সাড়া দেয়নি মিয়ানমার। নতুন চুক্তির প্রস্তাবের ব্যাপারেও কোনো কথা বলছে না। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান শুরুর পর ৫৩ দিন পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের ঢল থামছে না। ক্ষুধার্ত, নিঃস্ব, আতঙ্কিত কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মঙ্গলবারও পালংখালী হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পশ্চিম রাখাইনের বাসিন্দারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে খাবারের অভাবে, কারণ অধিকাংশ বাজার বন্ধ; ত্রাণকর্মীদেরও সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আগের মতোই সেনাবাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামে হামলা করছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একইভাবে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আসার পথে নৌকাডুবে প্রতি সপ্তাহেই তাদের মৃত্যুর খবর আসছে। এ নিয়ে গত দুই মাসে ২৬টি নৌকাডুবির ঘটনায় ১৮২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

    সংকট সমাধানে বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র। সূত্রমতে, কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে তিনটি প্রতিনিধিদল চীন, রাশিয়া ও ভারত সফর করবে। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতেও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, গত মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি যে পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তার মাধ্যমেই চলমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব হবে। তিনি এ কথাও বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা বিশ্বাস করি আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

    রোহিঙ্গা ইস্যু প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক বলেন, সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে। বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে।

    এদিকে মিয়ানমার মুখে সংকট সমাধানের কথা বললেও চলমান কর্মকাণ্ডে এর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার অং সান সু চি ও সেনাপ্রধান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা পরস্পরবিরোধী। একদিকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সু চি বলেন, রাখাইন থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই সপ্তাহ থেকেই মিয়ানমার সরকার সম্মিলিতভাবে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ছোট জাতিগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে কাজ শুরু করবে। অন্যদিকে একই দিন মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সিয়েলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং তার ফেসবুকে বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বাসিন্দা নয়। রোহিঙ্গা মুসলিমরা মিয়ানমারের জনগোষ্ঠী নয়। আর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা গণমাধ্যমে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি সেনাপ্রধান রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলেও মন্তব্য করেছেন। এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বরও অনুরূপভাবে ‘রোহিঙ্গারা স্বীকৃতি দাবি করছে অথচ তারা কখনো মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী ছিল না। এটি ‘বাঙালি’ ইস্যু’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

    বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার সময়ক্ষেপণে নতুন কৌশল নিয়েছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সু চি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু মিয়ানমারের সংবিধানে সেনাবাহিনীকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই সংকটের মূল রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে। সেখানে সেনাপ্রধান যদি রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করতে থাকে, তাহলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ফলপ্রসূ আলোচনা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাবিরোধী এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আদর্শের বিস্তার ঘটেছে। সে জায়গা থেকে নিজের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষায় সু চিকে দেশের জনমতের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে। তাই সু চির বক্তব্যে কতটুকু আস্থা রাখা যায়, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

    এদিকে সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার চতুর্থবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতেই হবে বলে একমতে পৌঁছেছে পরিষদের সদস্যরা। বৈঠকে তিনটি করণীয় বিষয়ে একমত পোষণ করেছে সদস্যরা। এগুলো হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান বন্ধ, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সসম্মানে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। এর আগে গত ২৮ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর তিনবার আলোচনায় বসে। সর্বশেষ বৈঠকে রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়। কিন্তু প্রতিবারের মতো শেষ বৈঠকেও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও চীন মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারে কথা হলেও এই দুই দেশের বিরোধিতার কারণে কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি।

    গত সোমবার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কারণে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সব ধরনের আমন্ত্রণ স্থগিত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। লুক্সেমবুর্গে ইউরোপীয় কাউন্সিলের এক বৈঠকে এই প্রস্তাব পাস হয় এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করে শরণার্থী সংকট অবসানে ঢাকার সঙ্গে আলোচনায় বসতে ইয়াঙ্গুনের প্রতি আহ্বান জানায় ইউরোপীয় কাউন্সিল।

    এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে। অবস্থা যেদিকে যাচ্ছে, তাতে খুব সহজে কিংবা অল্প সময়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের সম্ভাবনা কম। আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি, মিয়ানমারের সঙ্গে তা শুরুও হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের আলোচনা শুরু হয়েছে। সতর্কভাবে সে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।’

    এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আরো বলেন, ‘সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর যে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে, সেটিকে চলমান রাখতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন অব্যাহত থাকে; সেজন্য আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে হবে। মিয়ানমার চাইবে কালক্ষেপণ করতে, একসময় বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যেতে পারে—এ রকম একটা মুহূর্তের জন্য তারা অপেক্ষা করতে পারে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে।’

    একইভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক ও রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা এ পর্যন্ত বাংলাদেশে চলে এসেছে। শুরুটা হয় গত আগস্ট মাসে, মাঝে কয়েকদিন রোহিঙ্গা ঢল একটু কমে, এখন আবারও আসছে। তার মানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন থামছে না। মিয়ানমারের মন্ত্রী যেদিন বাংলাদেশে এসেছিলেন, সেদিনও রাখাইনে নির্যাতন চলে। এতে প্রমাণিত হয়, জাতিসংঘের চাপ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল কূটনীতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক চাপকে সাময়িক প্রশমনের জন্য মিয়ানমারের মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন এবং দ্বিপক্ষীভাবে আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধানের কথা বলেন। কিন্তু মিয়ানমারের এ আশ্বাসে বাংলাদেশের আস্থা রাখার কোনো কারণ ও ভিত্তি নেই। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশ কিছুই করতে পারবে না। কিছু করারও নেই। বাংলাদেশের উচিত আলোচনার মাধ্যমে বৈশ্বিক চাপ মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত রাখা। এ ছাড়া বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্মেলনেরও আয়োজন করতে পারে। এতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি অংশ নিলে বাংলাদেশের দাবি আরো জোরালো হবে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
    বোকরা নিষিদ্ধ! হাজীগঞ্জে বোরকা পরার অপরাধে আধাঁঘন্টা খাতা আটক রাখার অভিযোগ
    বোকরা নিষিদ্ধ! হাজীগঞ্জে বোরকা পরার অপরাধে আধাঁঘন্টা খাতা আটক রাখার অভিযোগ