• শিরোনাম

    ইমাম হুসাইন (আ.) এর সঙ্গীদের আত্মত্যাগ ও হুসাইনি সংগ্রামের প্রাসঙ্গিকতা

    | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৫:৫১ অপরাহ্ণ

    ইমাম হুসাইন (আ.) এর সঙ্গীদের আত্মত্যাগ ও হুসাইনি সংগ্রামের প্রাসঙ্গিকতা

    অনলাইন ডেস্ক ॥ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সংগ্রাম ছিল বিশ্বের ইতিহাসে ব্যাপকতম এবং বহুমাত্রিক আন্দোলন যার ব্যাপ্তি শুধুই যে আশুরার দিনের অন্যান্য মহান ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে তা-ই নয় বরং এই উক্তিটি উল্লেখ করাই যথার্থ যে, “প্রতিটি দিনই আশুরা আর প্রতিটি ময়দানই কারবালা।”

    আমরা আজ যে সময়টাতে উপনীত হয়েছি তখন আমরা মুসলমানরা ব্যক্তিগত এবং জাতিগতভাবেই আমাদের পরিচয় ভুলে গেছি। প্রকট আত্মপরিচয়হীনতা এবং আদর্শশূন্যতা আমাদের গ্রাস করে ফেলছে। আমরা আধ্যাত্মিক সত্তাকে হারিয়ে ফেলে ভোগবাদী ইন্দ্রিয়সর্বস্ব মানুষ পরিচয়ে বেড়ে উঠছি। কিন্তু দিন শেষে না পারছি ভোগবাদিতায় পাশ্চাত্যকে টেক্কা দিতে আর না পারছি বস্তুগত সুখ অর্জন করতে।

    এই সংকট আজ নতুন নয়। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের অল্প কিছুদিন পরই মিল্লাতে মুহাম্মাদি একই রাহুগ্রাসের সম্মুখীন হয় তখনই ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন আখেরি নবীর কনিষ্ঠ দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.)। আত্মপরিচয়হীন মিল্লাত, স্বৈরাচারী পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণি আর ইন্দ্রিয়সর্বস্ব আলেমশ্রেণির সামনে দাঁড়িয়ে কারবালার প্রান্তরে মহররমের ১০ তারিখ নিজের ৬ মাসের পুত্র আলী আসগার, নিকটতম আত্মীয় এবং মুষ্টিমেয় সঙ্গী সাথে নিয়ে কারবালার ময়দানে শাহাদাতবরণ করেন এবং আদর্শহীন ঘুমন্ত উম্মতে মুহাম্মাদীর উদ্দেশ্যে এই বাণীই রেখে যান যে, “জাগো! সাক্ষ্য দাও- স্বৈরাচার, পুঁজিবাদ, অনাচার, অযাচার, ভণ্ডামি, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে এবং তাওহীদ ও রিসালাতের পক্ষে।”

    webnewsdesign.com

    কারবালার সংগ্রাম ছিল ইমাম হুসাইন নামের এক মহান শিল্পীর দক্ষ হাতের তুলির ছোঁয়ায় আঁকা একটা অনবদ্য চিত্র। ইমাম এবং তাঁর আহলপুরিদের জীবনপরিচয়, অবদান, মজলুমিয়াত নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে এবং কলমের কালি সব ফুরিয়ে ফেললেও তাঁদের অবদানের সঠিক মূল্যায়ন আমরা করতে পারব না। তাই ইমামপুরিকে তাঁদের মাকামে রেখেই আজ পেশ করতে চাই ইমাম হুসাইনের সহযোগীদের পরিচয়- যাঁদের সম্পর্কে ইমাম আশুরার রাতে বলেছিলেন, “আমার সহযোগী এবং পরিজনদের চেয়ে উত্তম কোনো সহযোগী আর পরিজন খুঁজে পাইনি!” যার ফলে আমরা বুঝতে পারব কারবালার আদর্শিক সামগ্রিকতা এবং সর্বজনীন অনুপ্রেরণা।

    কারবালার সংগ্রাম কোনো জাতীয়তাবাদী লড়াই ছিল না। এটি রোমকদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের কিংবা পারসিদের বিরুদ্ধে আরবদের লড়াইও নয়। খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে, ইসলামের সম্প্রসারণের যুগে আমরা দেখি, অনেকেই বীরদর্পে লড়াই করে খেতাব অর্জন করে নেয় এবং অঞ্চল থেকে অঞ্চল ইসলামের পতাকার আওতায় আসে। কিন্তু এতে আখেরে বনি উমাইয়ার খাজাঞ্চিখানা এবং ইয়াজিদের হারেমই সমৃদ্ধ হয়েছিল বৈকি। বাস্তবতার চাপেই ইসলামের চেতনা ও আদর্শের পরিপূর্ণ প্রসারের আগেই দুনিয়া ত্যাগ করেছেন খোলাফায়ে রাশেদিন। আর, যখন কারবালার ময়দানে দাঁড়িয়ে ইসলামের তথাকথিত বীরসেনানিরা ইমাম হুসাইনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়, তখনি আমরা বুঝতে পারি যে, তারা ইসলাম নয়; বরং যুদ্ধবাজ সৈনিকচেতনা আর জাতীয়তাবাদী মানসিকতা থেকেই লড়াইয়ের ময়দানে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে। ইসলাম তাদের কাছে অপরিচিতই ছিল।

    অন্যদিকে ইমাম হুসাইনের কাফেলায় আমরা দেখতে পাই বনু আসাদ গোত্রের খাঁটি আরব মুসলিম বিন আওসাজাকে। আশুরার রাতে যখন ইমাম হুসাইন তাঁর সঙ্গীদেরকে বলেন, “তোমাদের প্রতি আমার আর কোনো দাবি নেই। শত্রুরা কেবল আমার মাথা চায়, তোমাদের নয়। তোমরা নিরাপদে কারবালার প্রান্তর ত্যাগ করতে পার। কিন্তু যারা যাবে না, তারা জেনে রাখ, আগামীকাল আমাদের সবাইকেই হত্যা করা হবে।”

    এই কথার প্রেক্ষিতে মুসলিম বিন আওসাজা বলেন, “আমরা কোনোভাবেই আপনাকে ছেড়ে যাব না… আমার হাতের বর্শা আর তরবারি মাটিতে পড়ার আগ পর্যন্ত আমি শত্রুদেরকে তা দিয়ে হত্যা করব, এরপর পাথর দিয়ে তাদের আঘাত করব, কোনো অবস্থাতেই নবীর বংশকে ফেলে যাব না। যদি আমাকে মেরে ফেলে আগুনে পোড়ানো হয় এবং আবার জীবিত করে পুনরায় একইভাবে হত্যা করে আগুনে পোড়ানো হয়, সেভাবে সত্তরবারও যদি মারা হয়, আমি তাও আপনার পক্ষে সংগ্রাম করেই যাব, আপনার পাশে থেকে শাহাদাতের সুধা লাভের প্রত্যাশায়।”

    ইমাম হুসাইনের সাথীদের মধ্যে ছিলেন ইরানি, তুর্কি কিংবা আবিসিনিয়ার দাসেরাও।

    হ্যাঁ, সংগ্রামটা দাসদেরও। রাসুলের সাহাবি আবু যার গিফারির আযাদকৃত জন ইবনে হুয়াই নামের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী আবিসিনিয় দাসের জন্যেও ছিল এটা শেষ লড়াই এবং পরম মুক্তি। আবু যার গিফারি যখন মদিনার বাইরে নির্বাসনে গেলেন, তারপর তাঁর আযাদকৃত দাস ছুটে এলেন চতুর্থ খলিফা ইমাম আলীর কাছে। এবং কোনোরকম দায়বদ্ধতা না থাকা সত্ত্বেও ইমাম আলী (আ.), তাঁর পর ইমাম হাসান (আ.) এবং তারপর ইমাম হুসাইন (আ.) এর বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে ছিলেন এই কালো দাস।

    আশুরার ঘটনার আগের দিন ইমাম হুসাইন (আ.) জনকে ডেকে এনে বললেন, “এতটা কাল আমাদের জন্য তুমি যথেষ্ট করেছ। এখন তুমি আমাদের ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পার।” জবাবে জন বলেছিলেন, “কত বড় অন্যায়ই না এটা হবে যে, আমি আপনাদের আপ্যায়ন এবং সাহচর্য থেকে এতকাল উপকৃত হয়ে আজ এখন আপনাদেরকে দুর্দিনে ফেলে চলে যাব!”

    কতই না আজব! শুধু জন নয়। ইমাম হাসানের আযাদকৃত দাস মুনযেহ, ইমাম আলীর আযাদকৃত দাস নাসর ইবনে নাইজার, ইমাম হুসাইনের আযাদ দাস আসলাম, সুলায়মান ইবনে রাজিন, ইমাম হুসাইনের মুক্ত দাসির পুত্র কারিবসহ এক বিরাট দাসশ্রেণি কারবালায় ময়দানে তাদের চরম মুক্তি খুঁজে নেয়, যে মুক্তি তাঁরা পালিয়ে যাওয়ার লোভনীয় প্রস্তাবেও খুঁজে পাননি। আসলে নবুয়্যতের গৃহবাসী (আলী, ফাতেমা, হাসান, হুসাইন) এবং তাঁদের অনুসারীদের থেকে যাঁরা মারেফাতের শিক্ষা পেয়েছেন তাঁদের কাছে এই দুনিয়া যেন আখেরি নবীর হাদিসের মতই কারাগারসম। (এই দুনিয়া মুমিনদের জন্য কারাগারের মতো, আর কাফেরদের জন্যে বেহেস্তসম- মুসলিম শরীফ)। তাই মৃত্যু বরং তাঁদের কাছে মুক্তির সমার্থক। কারবালার লড়াই এ পর্যায়ে যেন যুগের প্রলেতারিয়েত (শ্রমিকশ্রেণি) তথা নির্যাতিত দাসশ্রেণির লড়াই।

    ময়দানে যুদ্ধের সময় জন ইবনে হুয়াই কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন,

    “আল্লাহর পথে শাহাদাতকামী এক আত্মা আমার,

    আর হাতে সেই তরবারি যা শত্রুর রক্তপানের জন্য ক্ষুধার্ত,

    মৃত্যুর আগে আমি অবশ্যই আল্লাহর শত্রুদের প্রতিহত করব

    আমার তরবারি আর জিহ্বা উভয় দিয়েই রাসূলের দৌহিত্র হুসাইনের পক্ষে থাকব।”

    চোখে বর্শার আঘাত পেয়ে জন যখন মাটিতে পড়ে গেলেন, ইমামে হুসাইন এমন ভাবে ছুটে এলেন যেন তাঁর নিজ সন্তান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। জনের মাথাটা নিজের ঊরুতে রেখে একটা চুম্বন দিলেন তাঁর কপালে।

    জন কিন্তু মুসলমান ছিলেন না। ছিলেন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী।

    একজন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হয়ে যুদ্ধ করছেন ইমাম হুসাইনের পক্ষে! কিন্তু কেন?

    উত্তরটা শুনে নেই আরেকজন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর কাছ থেকে যিনি ইমামের পিছে থেকে যুদ্ধ করেছেন। তাঁর নাম ছিল ওয়াহাব ইবনে আব্দুল্লাহ আল কালবি। কুফার ধনাঢ্য খ্রিস্টান ব্যবসায়ী। কারবালায় ইমামের সংগ্রামের সময় তিনি কারবালার পাশ দিয়েই অতিক্রম করছিলেন। যেভাবেই হোক তিনি ইমামের মাজলুমিয়াত এবং সংগ্রামের ব্যাপারে আদ্যোপান্ত খোঁজ নিয়েছিলেন।

    এরপর ১৭ বছরের নববিবাহিত যুবক ওয়াহাব তাঁর মায়ের কাছে এসে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। “মা আমার কী করা উচিত এই অবস্থায়?”

    মমতাময়ী মা বললেন, “হে সন্তান। তুমি নিজের মনের মধ্যে কীরকম ভাবছ?”

    ওয়াহাব যে জবাব দিয়েছিলেন সেটা এরকম ছিল, “হে শ্রদ্ধেয় মা! আমার মতে হুসাইন ন্যায়ের পথে আছেন। পক্ষান্তরে ইয়াজিদি বাহিনীর রক্তলোলুপতা এমনকি আরবের সকল সংস্কার, যুদ্ধনীতিকেও চরমভাবে অপমান করেছে এবং তা অবশ্যই কাপুরুষোচিত। যদিও ইমামের সাথে থাকার অর্থ হচ্ছে অবধারিতভাবে মৃত্যুবরণ করা,তবুও আমার হৃদয় সেই দিকেই সায় দিচ্ছে।”

    হ্যাঁ, এটাই উত্তর। ইমামের ভাষা ছিল ফিতরাতের ভাষা। ফিতরাত হলো সহজাত প্রবৃত্তি। বিবেকবোধ। আকল। হৃদয়ের সকল সুকুমারবৃত্তি। এক কথায় মনুষত্ত্ব-হৃদয়ের ভাষা। সেই ভাষাতেই ইমাম ডেকেছিলেন!

    পাপ করতে করতে একসময় মানুষ এই ফিতরাতের ভাষা ভুলে যায়। ভোগবাদ তাকে সত্য বুঝতে পারা থেকে অন্ধ করে দেয়।

    এদিকে যখন এক খ্রিস্টান কালো দাস জন ইমামের জন্যে লড়াই করছেন, ইয়াজিদের দরবারে আরেক খ্রিস্টান উপদেষ্টা সারজুন ইয়াজিদকে বুদ্ধি দিচ্ছে কতটা নৃশংসভাবে ইমামপুরিকে হত্যা করা যায়।

    ইয়াজিদ অন্যায়ভাবে রাসুলের মিম্বর দখল করার পর কুফার অধিবাসীরা ইমামকে চিঠির পর চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেন, কুফায় এসে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে।

    আপাতদৃষ্টে এটা মনে হয় যে, ইমাম হয়ত কুফাবাসীর ডাকে সাড়া দিয়েই সংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এটি ঠিক নয়। ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন রজব মাসের শেষ দিকে যখন মদিনা ছেড়ে বের হন, তখনো কুফাবাসী থেকে একটাও চিঠি এসেছিল বলে ইতিহাসে লেখা নেই।

    বরং মদিনা থেকে মক্কায় পৌঁছার পর যখন কুফাবাসীর কাছ থেকে ইমামের কাছে চিঠি আসা শুরু করে, তার প্রেক্ষিতে ইবনে আব্বাস ইমামকে বলেন, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস কুফাবাসী আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।” জবাবে ইমাম বলেছিলেন, “তোমরা যা বলছো তা আমার অজ্ঞাত নয়, আমিও তা জানি।”

    যাই হোক, হযরত আলী (আ.) খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণকালে মিল্লাতে মুহাম্মাদির নেতা হলে, দলে দলে কুফার সুবিধাবাদি শ্রেণি ইমাম আলীর অনুসারীদের খাতায় নাম লেখাতে থাকে- এই আশায় যে, আখেরে যদি একটু বাড়তি সুবিধে মেলে। যদিও ইমাম আলীর খেলাফত লাভের আগে বা খেলাফত লাভের সময় কুফাতে ইমামের অনুসারী একটা দল ছিল, কিন্তু অচিরেই এই নব্য অনুসারীদের তর্জন-গর্জনে তাঁরা নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন।

    ইমাম হুসাইনের আন্দোলনের একটা বড় প্রাপ্তি ছিল, এদের মুখোশ উন্মোচন আর সত্যিকার অনুসারীদের বের করে আনা। ইয়াজিদের গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ যখন কুফাবাসীদের ওপর খড়গহস্ত হলো এবং স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে কুফাবাসী সুবিধাবাদী শ্রেণিটিকে কিনে নিতে থাকল, তখন হানি বিন উরওয়া, মাইসাম বিন তাম্মারের মত ইমাম আলীর অনুসারীদেরকে শহীদ করা হলো। মাইসাম-এর জিহ্বা কেটে খেজুর গাছে ক্রুশবিদ্ধ করা হলো। হানি বিন উরুওয়াকে শিরশ্ছেদ করা হলো। বীর মুখতার বিন সাকাফিকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটক রাখা হলো। আর কারবালার ময়দানে শহীদ হলেন কুফা থেকে পালিয়ে ইমামের কাফেলায় যোগ দেয়া মুসলিম বিন আওসাজা, হাবিব ইবনে মাজাহের, বুরাইর ইবনে খুজাই আল হামাদানিসহ আহলে বাইতের অনুগত একদল কুফাবাসী।

    এই কুফাবাসী অনুসারীদের সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে শহীদ হন যুহাইর ইবনে কাইন।

    এভাবেই একই কাতারে দাঁড়িয়ে ইমাম হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল দাস-ব্যবসায়ী, সাদা-কালো, আরব-অনারব, খ্রিস্টান-মুসলমান। ১৭ বছরের তরুণ ওয়াহাব আল কালবি কিংবা ১৩ বছরের কিশোর ইমাম হাসান-তনয় কাসিম থেকে শুরু করে সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ মুসলিম বিন আওসাজা, ৭৫ বছর বয়সী হাবিব ইবনে মাজায়ের।

    আর যুদ্ধ করেছিল নারীরা! বাড়ির রান্নাঘরে বসে নারীতে-নারীতে ঈর্ষা, কুটনামী কিংবা বাকসর্বস্ব নারী স্বাধীনতার জন্যে নয়; বরং নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে লড়াই করেছেন মানবতার মুক্তির জন্যে।

    ইমাম হুসাইনের পরিবারের নারীরা কীভাবে কারবালার সংগ্রামকে আকার দান করেছেন, তা বর্ণনা করা এই ক্ষুদ্র লেখনিতে সম্ভব নয়।

    শুধু বলব দু’জন নারীর কথা যারা ছিলেন ইমামপুরির বাইরে থেকে। একজনের নাম দাইলাম- যুহাইর ইবনে কাইনের স্ত্রী। আরেকজন ছিলেন উম্মে ওয়াহাব- ওয়াহাব আল কালবির মাতা।

    ইমামের কাফেলা কারবালার পথে যাওয়ার সময় তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল যুহাইরের বাহন। যুহাইর জানতেন, ইমাম অসহায় অবস্থায় পতিত। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, না জানি ইমাম তাঁর সাহায্য চেয়ে বসেন! হলোও তাই, ইমাম যুহাইরকে ডেকে পাঠালেন। যুহাইর ইমামের সাথে দেখা করতে অপারগতা জানালেন। এতে তাঁর স্ত্রী দাইলাম ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে তীব্র ভর্ৎসনা করলেন। যার ফলে লজ্জিত হয়ে যুহাইর ইমামের সাথে দেখা করেন। অল্প সময়ে এমন কী কথা হলো যে, ফিরে এসে যুহাইর তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সম্পর্কের বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, “দেখা হবে ঐ দুনিয়ায়!”

    আর ওয়াহাব আল কালবি যখন তাঁর স্ত্রীর থেকে বিদায় নেয়ার সময় সে কাঁদছিল, তখন ওয়াহাবের মা শংকিত ও বিরক্ত হচ্ছিলেন এই ভেবে যে, পরে না আবার ছেলেটা মন পালটে ফেলে। তাঁর ভাগ্যে যদি শাহাদাত নসীব না হয়!

    অবশেষে যখন ওয়াহাব শহীদ হলেন এবং ইয়াজিদি সৈন্যরা তাঁর ছিন্ন মস্তক ইমাম শিবিরের দিকে ছুড়ে দিল, তখন তাঁর মা মস্তকটা ইয়াজিদ সৈন্যদের দিকে পুনরায় ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘যা একবার আল্লাহর রাহে দান করেছি, তা আর ফেরত নেই না। তোমাকে অভিনন্দন ওয়াহাব! আল্লাহ তোমাকে জান্নাত নসীব করেছেন। আমি প্রত্যাশা করি আমিও দ্রুতই সেখানে তোমার সাথে মিলিত হব।’ এই কথা শুনে ইয়াজিদি সৈন্যরা তাঁকেও আঘাতে আঘাতে শহীদ করে।

    এভাবেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সৎ কাজের দাওয়াত আর অসৎ কাজ থেকে সতর্ক করার সংগ্রামে, স্বৈরাচার, পুঁজিবাদ আর অশ্লীলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইমামের ডাকে সাড়া দিয়ে একবিন্দুতে মিলিত হয়েছিল সমগ্র মানবতার একটা ক্ষুদ্র মডেল। তাঁরা ইমামের সাথে দাঁড়িয়ে সমস্বরে বলছেন, “জাগো ঘুমন্ত মানবতা, জাগো- সাক্ষ্য দাও!” আর তাঁদের এই ডাকের মর্মবাণী উপলব্ধি করার মাধ্যমেই আমরা পারি ক্ষুদ্র ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থকে ত্যাগ করতে এবং গোত্র ও মাজহাবের সংঘাত বন্ধ করে মানবতার বৃহত্তর স্বা্র্থে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যেতে। – পার্সটুডে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
    রামগঞ্জে আজহারীর মাহফিলে ধর্মান্তরিত সেই ১১ জন আটক
    রামগঞ্জে আজহারীর মাহফিলে ধর্মান্তরিত সেই ১১ জন আটক