• শিরোনাম

    আরও সুদৃঢ় হবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

    | ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

    আরও সুদৃঢ় হবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

    সুষমার বাংলাদেশ সফর

    আরও সুদৃঢ় হবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

    বিশেষ প্রতিবেদক,

    ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে অন্তত চারটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো হলো—রোহিঙ্গা ইস্যু, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও নির্বাচনী রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।

    বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে সবার ওপরে রাখার যে বিদেশনীতি ও বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ইতিবাচক মনোভাবের কথা সুষমা স্বরাজ প্রকাশ করেছেন, এর মধ্যদিয়ে শুধু এই অঞ্চলেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের এমন মনোভাবের ফলে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ অনেক সহজ হবে।

    webnewsdesign.com

    পাশাপাশি এই সফরের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা প্রকাশ পেল বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই সফর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারত সরকারের ইতিবাচক মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ও নির্বাচনী রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের জন্য স্বস্তিকর বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে বিশ্লেষকরা এমনও মনে করছেন, হোটেল লবিতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ ও সাক্ষাৎ শেষে নির্বাচন নিয়ে সুষমার খোলামেলা কথা না বলার মধ্য দিয়ে বিএনপির ব্যাপারে ভারত সরকারের কিছুটা হলেও নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। এ নিয়ে সে দেশের আনন্দবাজার পত্রিকাও বিএনপির সমালোচনা করেছে।

    সুষমার সফরকে দুটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক ঘটনার সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত অভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়েও সব সময় পুরো সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি না। কিছু সিদ্ধান্তে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো প্রভাব ফেলে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশকে গুরুত্ব দিতেই হয়। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়।

    যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকে অংশ নিতে এলেও সুষমার সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ও দেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন মুখ্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন এই উপাচার্য ও বিশ্লেষক। তিনি বলেন, কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচিত অনেক বিষয় বাইরে আসে না। তবে সুষমার সফরকে ঘিরে বিএনপির যে প্রত্যাশা ও আগ্রহ লক্ষ করা গেছে, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে সে আগ্রহে খুব লাভ হয়েছে বলে দেখি না। বিএনপি বলছে, সুষমা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চেয়েছেন। যদি সুষমা সে কথা বলে থাকেন এবং বিএনপি ভারতকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নিতেই হবে। বিএনপির প্রত্যাশা ছিল-সুষমা স্বরাজ নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা কথা বলুক। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কিছু বলুক। কিন্তু সুষমা এসব বিষয়ে কথা বলেননি। তার মানে আগামী নির্বাচনে ভারত কিছু চাপিয়ে দেবে বা নির্বাচনকালীন সরকারসহ আলোচিত বিভিন্ন ইস্যুতে নাক গলাবে বলে মনে হয় না।

    তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি এখন ‘সহায়ক সরকারের’ অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি করছে। শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে সেই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে অভিযোগ তাদের। এর মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা আসায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ ভোট করে আওয়ামী লীগ পার পাওয়ার জন্য তৎকালীন ভারত সরকারকে দায়ী করে আসছেন বিএনপি নেতারা। খালেদা জিয়ার মুখে ‘সমস্যাগুলো’ শুনে সেসব বিষয়ে সুষমা স্বরাজ কিছু বলেছেন কি না, তা জানাননি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম।

    তবে এই সফরের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিন প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীন, রাশিয়া ও ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে চীন ও রাশিয়া সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের ভেটোর কারণেই নিরাপত্তা পরিষদের দুই দফা বৈঠকে দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো প্রস্তাব পাস করা যায়নি। একইভাবে ভারত মিয়ানমার ইস্যুতে দ্বৈতনীতি নিয়ে চলছে শুরু থেকেই। একদিকে তারা বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে সহযোগিতা করে আসছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করে সংকট সমাধানে কোনো চাপ দিচ্ছে না। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতকে পাশে চাইছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে সে প্রত্যাশা পূরণ হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতেই হবে। এ ব্যাপারে ভারত কাজ করবে।

    রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুষমার এমন বক্তব্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক কারণেই চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মতো রাষ্ট্র পাশে থাকলে সে গুরুত্ব আরো বাড়বে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতে হলে চীন, রাশিয়া ও ভারতের লাগবে। বাংলাদেশকে এই তিন রাষ্ট্রকে দিয়ে মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে। শুধু এই রাষ্ট্রগুলোই পারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে কাজে লাগাতে পারে।

    এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, সুষমা স্বরাজের রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার যে বক্তব্য পত্রিকায় পড়েছি বা টিভিতে দেখেছি, বক্তব্যটির প্রভাব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পড়বে। যদি ভারত তা চায়। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারত যদি সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

    সুষমা স্বরাজ তার সফরের সময় ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা অনিষ্পন্ন ইস্যুর নিষ্পত্তির ব্যাপারে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন। এর মধ্যে তিস্তা ও অভিন্ন নদীর পানি চুক্তিসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। এ ব্যাপারে ভারতের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমরা সেগুলো জানি। সেগুলোর সমাধানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আজ আমরা সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছি। আমরা যৌথ উদ্যোগ নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করে সমাজকে রক্ষার পদক্ষেপ নিয়েছি। নিরাপত্তা ছাড়াও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সন্তোষজনক অগ্রগতি সাধন করেছি।

    এ ব্যাপারে সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, সুষমা বলেছেন কাজ করে যাব। কার্যক্রম তো চলছে। বিষয়গুলো সমাধান বা মীমাংসার জন্য তিনি তার সরকারের সদিচ্ছার কথা বলেছেন। এটি নির্ভর করবে ভারতের ইচ্ছের ওপর। দুই দেশের সম্পর্কের ওপর। কূটনীতিও জরুরি। শুধু আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না।

    সুষমার এই সফরকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, সুষমা স্বরাজের এ সফর রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তবে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা এই মুহূর্তেই বলা কঠিন। কারণ প্রটোকলের দিক থেকে তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পরের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার কথার গুরুত্ব আছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের এক সচিব বাংলাদেশে আসেন। তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। পরে দেখা যায়, এরশাদ হাসপাতালে ভর্তি হন। সুষমা স্বরাজের বক্তব্য অর্থাৎ ভারতের বক্তব্য আগের মতো নয়। তিনি সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেছেন, যা আমরাও বলছি। আমরা আশাবাদী যে ভালো কিছু হবে।

    এমনিতেই ভারতের বিদেশনীতিতে প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। সেই তালিকায় যে বাংলাদেশ সবার আগে রয়েছে, সে কথা জানিয়ে দিলেন ঢাকা সফর করে যাওয়া ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। গতকাল ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সেরি কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি বলেন-পড়শি পহলে, লেকিন বাংলাদেশ সবসে পহলে। অর্থাৎ প্রতিবেশী আগে, কিন্তু বাংলাদেশ সবার আগে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেমন আরো ইতিবাচক দিকে মোড় নিল, তেমনি ভারত পাশে থাকায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বাংলাদেশের নানাদিক থেকেই গুরুত্ব বাড়ল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

    এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, এবার বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা চুক্তি আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে আরো স্পষ্ট করল। সবকিছুই বন্ধুত্বের নিদর্শন। এই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করবে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
    বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি
    বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি