• শিরোনাম

    অনলাইনেও মাদকের হাট : ইয়াবার হোম ডেলিভারি!

    | ১৯ জানুয়ারি ২০১৮ | ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

    অনলাইনেও মাদকের হাট : ইয়াবার হোম ডেলিভারি!

    অনলাইনেও মাদকের হাট : ইয়াবার হোম ডেলিভারি!

    দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তরুণ সমাজ এখন মরণনেশা ইয়াবায় বুঁদ হয়ে আছে। মাদকের এ ভয়াবহতা ঠেকাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কাজও হচ্ছে। তবু কিছুতেই যেন কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে নিত্য ব্যবহারের জিনিসপত্র থেকে শুরু করে গবাদিপশু, গাড়ি, বাড়ি সবই কেনা যাচ্ছে অনলাইনে। অনলাইন শপিংয়ের এ সময়ে বাদ পড়ছে না মাদকও। অনলাইনে অর্ডার দিলে অন্যান্য পণ্যের মতোই বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদক। হোম ডেলিভারির এই সুযোগ লুফে নিচ্ছেন তরুণ মাদকসেবীরা। মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের অসংখ্য গ্রুপ রয়েছে ফেসবুক-টুইটার ও ইউটিউবে। এ ছাড়াও তারা ভাইবার, ইমো ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে চলছে মাদক কেনাবেচা। নিরাপত্তার জন্য সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে। মাদক বিক্রির ভার্চুয়াল হাটেও হানা দিতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দফতরের। তবে অনলাইনে মাদক বেচাকেনায় নজরদারি ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর ভয়াবহতা আরো বাড়বে; যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণে মুশকিল হয়ে উঠবে।

    রাজধানীর বাংলামোটরে ‘রেইন বাথ’ নামে টাইলসের ব্যবসা করতেন রবিউল ইসলাম। চীন থেকে টাইলস আমদানি করতেন তিনি। ‘রেইন বাথ’ নামে ফেসবুকে পেজ ও গ্রুপ চালাচ্ছিলেন রবিউল। এই গ্রুপে সক্রিয় থাকতেন তার স্ত্রী আসমা আহমেদ ডালিয়া, শ্যালিকা স্বপ্না ও নাসিরসহ আরো অনেকে। গ্রুপে চ্যাট করতেন। প্রয়োজনীয় কথা বলতে কল করতেন ভাইবার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে। তবে ভয়ংকর তথ্যটি হলো, এই ‘রেইন বাথের’ আড়ালে রবিউল মরণনেশা ইয়াবার ভয়ংকর কারবারি চালিয়ে আসছিলেন। মরণনেশা ইয়াবার পাইকারি বিক্রি করতেন। বিশ্বস্ত, পরিচিত বিক্রেতারা গ্রুপে চ্যাট করে অর্ডার দিতেন। কথাগুলো ছিল সাংকেতিক। অর্ডার নিয়ে যথাস্থানে তা পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি নিরাপদে টাইলসের শোরুম থেকেও ইয়াবা সংগ্রহ করতেন মাদকাসেবীরা। বিষয়টি নজরে পড়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি)।

    গত বছরের ৯ জুলাই এলিফ্যান্ট রোডের শেল সিদ্দিক বহুতল ভবনে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় রবিউল ও তার স্ত্রী ডালিয়াকে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে ধানমন্ডি থেকে ডালিয়ার বোন স্বপ্না ও তার স্বামী শামীম আহমেদসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটও জব্দ করে ডিএনসি। জিজ্ঞাসাবাদে এই ইয়াবা পরিবারের সদস্যরা এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। শুধু ‘রেইন বাথ’ নয়, একইভাবে বংশালের এমএস মার্কেটে ইলেকট্রনিকের পণ্যের গুদামে রাখা হতো কোটি কোটি টাকার ইয়াবা। অর্ডার দেওয়া হতো অনলাইনে। পরে গত ১২ অক্টোবর এমএস মার্কেটে অভিযান চালিয়ে কোটি টাকা মূল্যের ৩০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন চট্টগ্রামের মহিউদ্দিন ইসলাম, নোয়াখালীর সুধারামের মোবারক হোসেন বাবু ও ঝালকাঠির দুলাল চন্দ্র শীল।

    webnewsdesign.com

    ডিএনসির পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন জানান, এই চক্রের মূল হোতা নাসির উদ্দিন। তারা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে মাদক ঢাকায় পাঠাতেন। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অনলাইনে অর্ডার নিতেন। বিশেষ করে চ্যাটের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া হতো। কথা বলতেন ইমো, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপে। অর্ডার আগেই নিয়ে রাখার কারণে মাদক পৌঁছার পরপরই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। তাদের ক্রেতারা মূলত মাদকের ছোট পর্যায়ের ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীরা পরে খুচরা বিক্রি করতেন। চক্রের অনেকে গ্রেফতার হলেও মূল হোতা নাসির উদ্দিন পলাতক।

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রয়েছে ডিজে পার্টি ঢাকা, ডিজে ঢাকা এ রকম নানা নামের পেজ। এতে রয়েছে বিভিন্ন পার্টি সংবাদ সংক্রান্ত পোস্ট। ইরফান আদনান নামে নিকেতনের এক যুবক জানান, একবার অনলাইনে পার্টির টিকিট নিতে গিয়ে ফোন ও মেইল ঠিকানা দিয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকে তার ইমোতে কল দিয়ে প্রায়ই আমন্ত্রণ জানানো হয়। নানা ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিছুদিন আগেও গাজীপুরের একটি রিসোর্টে ডিজে পার্টি হচ্ছে জানিয়ে তাকে ইমোতে কল দিয়ে বলা হয়, ‘স্যার, আপনারা কজন আসবেন। কাপল হলে একটি টিকিটের মূল্য অর্ধেক রাখা হবে। আর আপনি একা এলে আমাদের ব্যবস্থা আছে। আপনি চাইলে আমরা এসকর্টের ব্যবস্থা করে দেব। সব ধরনের ড্রিংকস রয়েছে এখানে। তবে বাবা পেতে হলে আগে অর্ডার প্লিজ।’ এভাবেই নিরাপদে অনলাইনে চলছে পার্টির নামে ভয়ংকর বাণিজ্য।

    মোহাম্মদপুরের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন সুচন্দা ছন্দা (ছদ্মনাম) জানান, তিনি অনলাইনেই মাদকের অর্ডার দিতেন। টাকা দিতেন সরাসরি, কখনো অগ্রিম পাঠিয়ে দিতেন বিকাশে। বন্ধুদের সঙ্গে শখের বসে গাঁজা সেবন করেছিলেন কয়েকবার। কখনো ভাবতে পারেননি মাদকে আসক্ত হবেন তিনি। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। এরই মধ্যে দুঃসহ যন্ত্রণা তাকে চেপে বসে। কয়েক বছর প্রেম করেছেন। স্বামী-স্ত্রীর মতো সময় কাটিয়েছেন তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মায়ের পছন্দে প্রেমিক অন্য মেয়েকে বিয়ে করে ঘর বাঁধেন। তারপর থেকে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি ছন্দা। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে ফেসবুকের ইনডেক্স চ্যাট করেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন ভালো লাগে না। এরইমধ্যে এক বন্ধুর কাছে গাঁজা খুঁজেন তিনি। সেই বন্ধু তাদের একটি গ্রুপে যুক্ত করে নেয় ছন্দাকে। ফেসবুকের ওই গ্রুপ মাদক বিক্রি করে। একইভাবে বলে দেওয়া হয় সেবনের পদ্ধতি। এমনকি ইউটিউবেও সেবনের পদ্ধতিসংবলিত ভিডিও আপলোড করা রয়েছে তাদের। প্রথম কদিন সেবন করলেও পরে দুর্গন্ধের কারণে তা থেকে সরে যান। শুরু করেন ইয়াবা সেবন। ওই গ্রুপের বন্ধুরা শিখিয়ে দেন কীভাবে ইয়াবা সেবন করতে হবে। ছন্দা জানান, তিনি নিজেও ঘনিষ্ঠ কয়েক বন্ধুকে নিয়ে গ্রুপ করেছিলেন। সেখানে কথা বলে প্রায়ই বন্ধুরা মিলে বাসায় আড্ডার ব্যবস্থা করতেন। আড্ডায় মাদক সরবরাহ করতেন অনলাইনের বন্ধুরা। কয়েক বন্ধু ছিলেন যারা নিজেরা মাদক সেবন ও বিক্রি করতেন।

    মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ জানান, অপরাধীরা যেভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। তাদের শনাক্ত করতে আমাদেরও সে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। দক্ষ জনবলও প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত সে ধরনের সাপোর্ট মাদকদ্রব্য অধিদফতরের নেই।

    এদিকে দেশের ৬০ জেলায় গত এক বছরে ভয়াবহ মাদক ইয়াবা সংক্রান্ত মামলা হলেও বিস্ময়করভাবে বাকি ৪ জেলা ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান, পটুয়াখালী ও ভোলায় একটিও মামলা হয়নি। উদ্ধার হয়নি একটিও ইয়াবা। সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য মাদকদ্রব্য যেমন ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা সরবরাহ কমলেও প্রতিবছর বাড়ছে ইয়াবার সরবরাহ। আর সব ধরনের মাদকের সবচে ‘বড় হাট’ রাজধানী ঢাকা। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় মাদক হাটের বিস্তার ঘটেছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টাঙ্গাইল এবং ময়মনসিংহে।

    ডিএনসির পরিচালক ও পুলিশের ডিআইজি সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৬৪ জেলার মধ্যে চার জেলায় ইয়াবা নিয়ে গত এক বছরে কোনো মামলা হয়নি। এজন্য বলা যাবে না এসব জেলায় ইয়াবা নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সব জেলায়। তিনি বলেন, এই চার জেলায় কেন ইয়াবা নিয়ে কোনো মামলা হয়নি, এজন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষেই এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাবে। কোনো ব্যর্থতা থাকলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

    মাদক পাচারের যত কৌশল : একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করে অভিনব কৌশলে রাজধানীতে মাদকের চালান আনা হচ্ছে। নারিকেল, বার্মিজ জুতা, মিষ্টিকুমড়া, অ্যাম্বুলেন্স, কুরিয়ার সার্ভিস, সবজি ও ফসলের ট্রাক, গাড়ির বডি ও চেসিস, কফিন, তেলের ড্রাম, প্লাইউডের ভেতরে করে ইয়াবা আনা হচ্ছে। এ ছাড়া নারী-পুরুষের সংবেদনশীল অঙ্গেও আনা হচ্ছে ইয়াবা। তবে ফেনসিডিল বেশির ভাগ আসছে প্রাইভেট কার কিংবা বড় গাড়িতে। কম্পিউটার মনিটর, সিপিইউ, ব্যাটারি, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাছের পোনা বহনকারী ড্রামের ভেতরে মাদকদ্রব্য বহন করা হয়। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সাংবাদিক, প্রেস, সংবাদপত্র ও মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো গাড়িতে করেও তা বহন করা হয়।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
    বোকরা নিষিদ্ধ! হাজীগঞ্জে বোরকা পরার অপরাধে আধাঁঘন্টা খাতা আটক রাখার অভিযোগ
    বোকরা নিষিদ্ধ! হাজীগঞ্জে বোরকা পরার অপরাধে আধাঁঘন্টা খাতা আটক রাখার অভিযোগ