• শিরোনাম

    অকেজো হচ্ছে হুদা কমিশনের ইভিএম

    | ১৩ অক্টোবর ২০১৭ | ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ

    অকেজো হচ্ছে হুদা কমিশনের ইভিএম

    অকেজো হচ্ছে হুদা কমিশনের ইভিএম

    ধংস করা হবে এক-এগারোর ড. শামসুল হুদা কমিশনের কেনা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। সে সময় কেনা সব ইভিএম অকেজো-পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই কাজটির জন্য আট সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছে। তাদের দেওয়া সুপারিশের আলোকে এগুলো ধ্বংস করা হবে। এর মাধ্যমে প্রথম উদ্ভাবিত প্রযুক্তির অস্তিত্ব বিলোপ ঘটবে এবং নতুন উদ্ভাবিত ইভিএমের কাজ এগিয়ে গেছে অনেক দূর। এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রযুক্তিটির পেছনে যত শ্রম, মেধা, সময় ও অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তার পুরোটাই গচ্চা যাবে। গচ্চা যাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা। এদিকে, হুদা কমিশনের ইভিএম বাদ দিয়ে নতুন ইভিএমে আগামীতে নির্বাচন করার কথা ভাবছে ইসি। ইতোমধ্যে নতুন উদ্ভাবিত ইভিএমের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে।

    এদিকে, ব্যালটের বিকল্প উদ্ভাবিত ইভিএম শুরুতে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল ১/১১-এর পুনর্গঠিত কমিশন। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে কয়েকটি ওয়ার্ডে এই প্রযুক্তির ব্যবহার করে সুফল মেলে। পরবর্তীতে যতগুলো নির্বাচনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হয়, সব কটিতে ত্রুটি ধরা পড়ে। কিন্তু বিজিত ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান কম থাকায় আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসেনি। ফলে হুদা কমিশন স্বস্তিতে বিদায় নিতে পারে। তাছাড়া নির্বাচনে ত্রুটি সমাধানে নানামুখী উদ্যোগও নিয়েছিল সে সময়ের কমিশন। পরবর্তীতে রকিবউদ্দীন কমিশন যান্ত্রিক ত্রুটি সমাধানে রেখে যাওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে। অন্য নির্বাচনের ত্রুটি বড় আকার না হলেও রাসিকে ইভিএমের যান্ত্রিক ত্রুটি রকিব কমিশনকে সংকটে ফেলে। তখন থেকে বুয়েটের উদ্ভাবনকারীদের সঙ্গে গত কমিশনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এমনকি নির্বাচনে তারা এই প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এটা করেই ক্ষান্ত হয়নি রকিব কমিশন। বুয়েট ইভিএম তৈরিতে দুর্নীতি করেছে, এমন অভিযোগ আনে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি তদন্ত করে। কিন্তু কমিশন তদন্তে নির্দোষ ঘোষণা করে বুয়েটকে।

    অপরদিকে, রকিব কমিশন ওই ইভিএমকে সর্বোচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর বলে দাবি করে। তাদের যুক্তি, ইলেকট্র্রনিক যন্ত্রে ত্রুটি থাকবে, তা সমাধানযোগ্য। অপরদিকে, ইভিএমের প্রবর্তক সাবেক নির্বাচন কমিশনও বুয়েটের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছে, ত্রুটি ছিল, তা সমাধানেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ত্রুটির অজুহাতে একটি প্রযুক্তির বিলুপ্তি ঘটানো কতটুকু যুক্তিসংগত-প্রশ্ন-সাপেক্ষ বিষয়। আর সদ্য বিদায়ী নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহার স্থগিত করার পর বর্তমান কমিশন একটি প্রযুক্তির ইতি ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ-বিএনপি শুরু থেকেই ইভিএম ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ছিল। প্রযুক্তির পক্ষে আওয়ামী লীগ এবং বিপরীত মেরুতে বিএনপি।

    webnewsdesign.com

    আগামী রোববার বিএনপির সঙ্গে ইসির সংলাপ হবে। সংলাপে বসার আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম চায় না বিএনপি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। দলটির সঙ্গে ইসির সংলাপ হবে আগামী ১৮ অক্টোবর।

    ইভিএম অকেজো করা-সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এক-এগারো কমিশনের উদ্ভাবিত কমিশনের সব ইভিএম অকেজো ঘোষণা করতে তাকে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ইসি। এই কমিটি প্রযুক্তিটির সব কারিগরি দিক তদন্ত করে সুপারিশ করবে। সুপারিশে ইভিএমগুলোকে ধ্বংস করার প্রস্তাব থাকতে পারে। কারণ এটি দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এটিকে কাজে লাগিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।

    আর বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও ইভিএমের উদ্ভাবক লুৎফুল কবির বলেন, তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে কেন অকেজো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান কমিশন, তা আমার বোধগম্য নয়। যান্ত্রিক ত্রুটি এটা ইসির পক্ষের অভিযোগ। কারণ আমাদের উদ্ভাবিত ইভিএম উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর। এতে কোনো দুর্নীতি ও কারসাজি ছিল না। তবে, নতুন ইভিএম উদ্ভাবনের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিলে সঠিক আছে। তবে, ত্রুটির অজুহাত দেখানো হলে আমাদের আপত্তি শুরুতে ছিল, আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে।

    আর সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, প্রযুক্তি তৈরি হয় নতুন আরেকটি প্রযুক্তির উদ্ভাবনের জন্য। কিন্তু একটি প্রযুক্তির মৃত্যু ঘটিয়ে আরেকটি বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত প্রতিহিংসার বহির্প্রকাশ। এটা কারো কাম্য হতে পারে না।

    ইভিএম সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১০ সালের দিকে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আর চসিকের কয়েকটি ওয়ার্ডে প্রথম উদ্ভাবিত ইভিএমে ভোট হয়। এটি ছিল নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতীক-সংবলিত ইভিএম। ব্যাটারিতে চার্জ দিয়ে এটিকে সচল রাখা হতো। এই প্রযুক্তির ইভিএমের প্রত্যেকটির জন্য ব্যয় হয়েছিল সাড়ে ১০ হাজার টাকা। পরে পুরো ইভিএম সিস্টেমে পরিবর্তন আনা হয়। ইভিএমের সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যার এবং চীনের উন্নত মানের ব্যাটারি-সংবলিত ইভিএমের প্রবর্তন করা হয়। পাশাপাশি প্রথমে তৈরি ইভিএমে ১০ জনের বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হলে ভোট নেওয়া যেত না; কারণ প্রতীক নির্দিষ্ট ছিল। পরে উদ্ভাবিত ইভিএমে স্থানীয় নির্বাচনের মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলরদের জন্য আলাদা আলাদা প্রতীক সংরক্ষণ এবং প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও ভোট নেওয়ায় কোনো জটিলতা তৈরি হতো না। এই প্রযুক্তিতে সংস্কারের কারণে ব্যয় বাড়ে কয়েকগুণ। এনালগ সিস্টেমে একটি ইভিএমে প্রথমে যেখানে সাড়ে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল; পরবর্তীতে কেনা প্রায় এক হাজার ৮০টি ইভিএমের প্রত্যেকটির জন্য ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। এ হিসাবে ইভিএমের পেছনে ব্যয় হয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

    এত বিনিয়োগ করার পরও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক), নরসিংদী পৌরসভা, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) ও এলেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যবহার হওয়া ইভিএমে ত্রুটি দেখা দেয়। কিন্তু ভোটের ব্যবধান কম থাকায় খবরটি জানা জানি হয়নি। এসব ত্রুটি সমাধানে সাবেক শামসুল হুদা কমিশন বুয়েটের ভিসি ও বিএমটিএফ প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে। তাদের বিদায়ের আগে একটি সুপারিশও রেখে যান। কিন্তু পরবর্তী কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন বিষয়টি আমলে না নিয়ে খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে। তবে, বুয়েটের ব্যবহার হওয়া চায়না ব্যাটারির মূল্য অনেক বেশি এ অজুহাতে বিদায়ী কমিশন ওই সিটি নির্বাচনের ইভিএমে দেশীয় চান্দা ব্যাটারি ব্যবহার করে। পরে রাসিক সিটির একটি ওয়ার্ডে ইভিএম হ্যাক করলে তুলকালাম পরিবেশ তৈরি হয়। এমনকি বুয়েটকে ত্রুটি সংশোধনের অনুরোধ জানালেও তারা আগ্রহী হয়নি। বুয়েট যুক্তি দাঁড় করিয়ে বিদায়ী কমিশনকে জানিয়েছিল, তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ইভিএমের সঙ্গে লোকাল ব্যাটারি সার্পোটযোগ্য নয়।

    এ নিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছে। পরবর্তীতে বুয়েটের ইভিএমকে বিদায় জানিয়ে এনআইডির সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন ইভিএমে ঝোঁকে ইসি। আগামী ডিসেম্বরে অনুুষ্ঠিত রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনে নতুন উদ্ভাবিত ইভিএম ব্যবহারের আগে পুরোনো ইভিএমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত বুধবার জারি করা আট সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমানকে। এতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি), বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) এবং ইসির সিনিয়র মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এই কমিটির সুপারিশের আলোকে অস্তিত্ব বিলীন হবে এক-এগারো ড. শামসুল হুদা কমিশনের যন্ত্রে ভোটদান পদ্ধতির উদ্ভাবিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম)।

    এছাড়া বিভিন্ন সময়ে কেনা ইভিএমের সংখ্যা এক হাজার ১০০। এর মধ্যে নির্বাচন ভবনে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মাঠপর্যায়ে কিছু ইভিএম সংরক্ষিত ছিল। এসব ইভিএম একত্রিত করতে কমিশন থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্তের আগে এসব ইভিএম নির্বাচন ভবনে একত্রিত করে ধ্বংস করা হবে।

    Leave a comment

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
    হাজীগঞ্জে ছোট বোনের হাতে বড় বোন খুন
    হাজীগঞ্জে ছোট বোনের হাতে বড় বোন খুন